ডা. সাঈদ এনাম:
গতকাল জানি কি নিয়ে লিখবো ভেবেছিলাম, কিন্তু পরে ভাবনাটা হারিয়ে যায়
কোথায়। হারিয়ে যাবার অবশ্য যৌক্তিক কারণ ছিলো। কারণটি হলো, স্ত্রী বললেন,
রঞ্জিত দুধে বেশি পরিমানে পানি মিশিয়ে দিচ্ছে ইদানীং। একদম পাতলা। দুধে
পানি মিশাচ্ছে না পানিতে দুধ মিশাচ্ছে বুঝা যাচ্ছেনা…।
আমি তাই লেখালেখির ভাবনা রেখে বসে বসে রঞ্জিতের অপেক্ষা করছিলাম। আজ ব্যাটাকে একটা ঝাঁকুনি দিতে হবে। মাঝে মধ্যে কয়েক মাস পর পর ওকে একটা ঝাকুনি দিতে হয়। ওতেই কাজ হয়ে যায়। পানির পরিমান প্রমান মাত্রায় চলে আসে। তাই এগারোটা বাজার অপেক্ষা করছিলাম। ও রোজ এগারোটায় আসে।
জাস্ট এগারোটায় কলিং বেল টিপার শব্দ হলে আমি বুঝলাম ও এসেছে দুধ নিয়ে। দরজার ওপাশ সে তার স্বভাব সুলভ জোরে জোরে ডাক পাড়ে ,
” দুধ দুধ, আফ্রিদা মা’মনি কই। কই আমার ছোট রানী মা…”।
আমার ছোট মেয়ে আফ্রিদা দৌড়ে যায় দুধের বোতল আনতে। আমার বড় মেয়েটা যখন ছোট ছিলো তখন সেই আনতো দুধ রঞ্জিত এর কাছ থেকে। এরপর এ দায়িত্ব পড়ে ছেলে আদিয়ানের উপর। আফ্রিদা আদিয়ান প্রায় সমবয়সী। তাই এখন পালাক্রমে একদিন ছোট মেয়ে আফ্রিদাকে রঞ্জিত দা ডাকেন। আরেকদিন ডাকেন আদিয়ানকে। আদিয়ানকে আবার একটু স্টাইল করে ডাকতে হয়ে। নাহলে যায়না। রঞ্জিতদা তাই একটু স্টাইল করেন। “…কই রাজপুত্র আদিয়ান সাহেব”। আদিয়ানকে আবার “সাহেব” বলতে হয়। মাঝে মাধ্যে তাকে আবার “ছোট ডাক্তার” বলে ডাকেন রঞ্জিত দা। “কই আমার ছোট ডাক্তার সাহেব”। আদিয়ান দৌড়ে যায়। আজ দুজনকেই বারণ করা আছে। কারণ আজ ধরাস করে ধরাশায়ী করা হবে রঞ্জিত দাকে।
এই রঞ্জিতদা অনেক আগে থেকেই আমার বাসায় দুধ দেন। প্রায় সাত কি আট বছর হবে। তার আগে আমার বাসায় দুধ দিতো রিংকু নামের একটি ছেলে। সম্পর্কে রঞ্জিতের ভাইপো।
রিংকুর আমার বাসায় দুধ দেবার ছোট একটা কাহিনী আছে। নতুন পোস্টিং, নতুন চেম্বার। মফস্বল থেকে একটু দূরে। একদিন চেম্বার থেকে ফিরছি। পাশেই রাস্তায় একটা গরুর হাট চলছিলো। ভাবলাম যাই একটু ঢু মেরে আসি। অচেনা আপরিচিত জায়গায় ঢু মেরে টুকটাক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নেয়ার অভ্যাসটা আমার সেই হোস্টেল জীবনের। একদিন আইটেম (মেডিকেলের ভাইবা পরীক্ষা) শেষ করে সন্ধ্যায় বসি আছি। আইটেমটা একটু বড় ছিলো, এনাটমির এবডোমেন। এ সময় হঠাৎ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেলের হোস্টেল থেকে ফোন করলো জাহাঙ্গীর ,
“বন্ধু কই…”?
আমি বললাম এইতো হোস্টেলে। আমি তখন ঢাকা মেডিকেল ফজলে রাব্বি হোস্টেলের মেইন বিল্ডিং এর ১৩০ নাম্বার রুমে থাকতাম। তার ছাদে বসে আছি। জাহাংগীর বলল, যাবে নাকি ঘুরতে নৌকা দিয়ে বুড়িগংগায়, আজ কি সুন্দর পুর্নিমা।
আমি বললাম, যাবো না মানে আলবৎ যাবো। তুই ব্যবস্থা কর আমি আসছি।
ব্যাস আর কথা নাই। রাত ১২টা পর্যন্ত কয়েকজন বন্ধু মিলে নৌকা দিয়ে ঘুরাঘুরি আর বেসুরো গলায় গান গাইতে থাকতাম। যাইহোক এ রকমই টাইমে বেটাইমে অদ্ভুত রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কিছু বদঅভ্যাস নেয়ার বাতিক ছিলো আমাদের কয়েকটা সহপাঠীর মধ্যে।
তো যে কথায় ছিলাম, আমি রাস্তার পাশে গরুর হাটে ঢুকে দেখছি গরুর হাট। সারি সারি অনেকগুলো গরু। লাল কালো সাদা কোনটা আবার কালো সাদা মিক্সড। নানান রঙ এর, নানান ঢং এর। এসময় দেখলাম এক বৃদ্ধ লোক একটি গাভী বাছুরসহ বিক্রি করবে বলে হাটে তুলেছেন। টকটকে লাল সুঠাম গাভী। সাথে বাছুরও একটা। ওটা একটু কালচে ধাচের । কপালে তার আবার সুন্দর একটা সাদা টিকা। বাছুর টি ছুটোছুটি করছে, এদিক ওদিক। মনে হচ্ছে হাটে এসে তার খুব ভালো লাগছে। কখনো দৌড়ে যাচ্ছে এ থেকে ঐ মাথা। এতো সুন্দর একটা দৃশ্য। আমার খুব ভালো লাগে বাছুর সমেত গাভীটিকে।
যিনি হাটে তুলেছেন সেই বৃদ্ধকে বললাম কি ব্যাপার, চাচা মিয়া এতোদিন পুষলেন, বড় করলেন, এখন দুধ খাবার সময় এলো। এখন কেনো বিক্রি করে দিবেন?
তিনি বললেন, তার ছেলের ভিসা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে। জরুরী ভিত্তিতে টাকার প্রয়োজন। না হলে ভিসা ক্যানসেল হয়ে যাবে। তাই অনিচ্ছা স্বত্বেও বিক্রি করে দিচ্ছেন।
তার চোখে ভালো এবং মন্দ দুই ধরনের অশ্রু খেলা করছিলো কথাগুলো বলতে যেয়া। আমি খেয়াল করলাম এটি। একদিকে অতি প্রিয় বাছুর সমেত গাভী, অন্য দিকে ছেলের বিদেশ যাত্রা।
আমি বললাম, দাম কতো। তিনি বললেন, ত্রিশ হাজার। তবে আপনি ডাক্তার সাব আপনার জন্যে একটু কম আছে। আপনাকে আমি চিনি।
আমি বললাম, আমার খুব পছন্দ হয়েছে, তা কতো হলে ছেড়ে দিবেন।
তিনি এদিক ওদিক তাকিয়ে কানে কানে ফিস ফিস করে বললেন, আঠাশ হলে কাফি।
ভাবলাম মন্দ না, নগদ ফ্রেস দুধ পাওয়া যাবে। বিশেষ করে আম্মার জন্যে ভালো হবে। যথেস্ট বয়স হয়েছে উনার। উনার উপকারই বেশি হবে। এ বয়সে তার ফ্রেস খাবার দাবার প্রয়োজন। তাই আর আমি আগ পিছ না ভেবে বললাম, চাচা মিয়া সবই ঠিক, কিন্ত এতো টাকাতো সাথে নাই। চেম্বার থেকে মাত্র আসছি…।
আসলে সে সময় পকেটে এতো টাকা থাকার কথা না। নতুন ডাক্তার। মাত্র জয়েন করেছি গ্রামের সাব সেন্টারে। টুক টাক চেম্বার শুরু করেছি। ওদিয়ে চলি আর বেতনের টাকা জমাই পোস্ট গ্রাজুয়েশন-এর সময়কালীনের জন্যে। কারণ সে সময় চেম্বার করা যায় না। যাকগে, নতুন চেম্বার, একদিন চেম্বার করলে আর কতই বা হবে। দু’তিন হাজার বড়জোর। ওদিয়ে তো এখন আর স্বাধ পুরন হচ্ছে না।
তিনি বললেন, অসুবিধা নাই ডাক্তার সাব। আমি চিনি আপনাকে। আপনার পছন্দ হলে বলেন, আমি বাসায় দিয়ে আসবো। তখন টাকা দিয়েন।
আমি গাভীটার দিকে আবার তাকালাম। খুবই সুন্দর। আর সাথের বাচ্চাটাও বেশ। বললাম, ঠিক আছে। চলে আসেন নিয়ে।
বাসায় এসেতো পড়লাম মহা বিপত্তিতে। আম্মা বললেন,
করেছিস কি এটা।
আমি বললাম, আম্মা খুব মায়া লাগছিলো গাভি আর বাছুরকে। তাছাড়া ভাবলাম তোমারও বয়স হয়েছে, এখন একটু ভালো ফ্রেস খাবার, দুধ ডিম এগুলো খাওয়া দরকার। বাজারের দুধগুলো কি আর দুধ, সব কেমিক্যাল মেশানো।
তিনি বললেন, তাই বলে আস্ত একটা গাভী। আর এটা কিনলেই হলো। এটাকে খাওয়াবি কি, দেখাশুনো করবে কে, যত্ন করবে কে, এটার জন্যে আলাদা ঘর লাগবে, ঘাস লাগবে। এটা তুই কি করেছিস। তাছাড়া শহরে কেউ কি গাভি পোষে। যা যা ফেরৎ পাঠা।
আম্মার কথায় আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম। সত্যি তাইতো। ভীষণ একটা ইমোশনাল কাজ করে ফেলেছি। সত্যিই তো দুধেল গাভী আর বাছুরের অনেক যত্ন করতে হয়। খাওয়াতে হয়। তবেই না খাঁটি দুধ।
কিন্তু ফেরত দিতে মনটা একদম সায় দিলো না। গাভীর গায়ে একটু হাত বুলালাম। সে ও তার জিহবা দিয়ে আমার হাতটা একটু চেটে দিলো।
গৃহপালিত পশু গরু ছাগল, বিড়াল এগুলো খুব আদর বুঝে। ছোট বাছুরটাও ইতিমধ্যে ছুটোছুটি শুরু করে দিয়েছে করছে বাসার ভিতর এমাথা থেকে ওমাথা। যেনো তার খুব পরিচিত।
কি করা যায় ভাবতা ভাবতে হঠাৎ মীরা দিদি মনির কথা মনে পড়লো। মীরা দিদি আমার প্রতিবেশী। আমার সাবসেন্টারের পাশে উনার স্কুল ছিলো। আসতে যেতে প্রায়শই উনার সাথে দেখা হতো। তাছাড়া দিদির স্বামী ছিলেন আমাদের ছেলে বেলার হাই স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক। আমার প্রাইভেট টিচার।
দিদিকে ফোন দিলাম, দিদি একটা ভুল করে ফেলেছি।
কি ভুল ডাক্তার সাব?
দিদি একটা গাভী কিনে ফেলেছি বাছুরসহ। আসলে এতো মায়া লাগছিলো, তাছাড়া ভাবলাম আম্মার বয়স হয়েছে, এ বয়সে ফ্রেস দুধ মধু এগুলো বেশি বেশি উনার খাওয়া উচিৎ …,
তিনি ওপাশ থেকে কথা শেষ হবার আগেই হো হো করে হেসে উঠলেন।
“এইটা তুমি কি করছো সাঈদ..”।
“জ্বী দিদি। করেই তো ফেলেছি। এখন কি করবো ঐটা বলেন। হাসি রাখেন”।
দিদি হাসি থামাতে পারছেন না। বললেন, “দাঁড়াও তোমাদের স্যারের সাথে একটু আলাপ করে নেই। তোমাকে বোকা জানতাম, কেবল ডাক্তারি বুঝো, তবে এতোটা যে বোকা, সেটা জানতাম না। চিন্তা করো না। মাসীকেও বলো চিন্তা না করতে। আমি একটা উপায় বের করছি, তোমার স্যারের সাথে আলাপ করে..”।
আমি খুশি হয়ে বললাম, “প্লিজ দিদিমিনি একটা কিছু করেন। আর স্যারকে ডিটেইল কিছু বলবেন না। স্যার আবার কিনা কি বলেন”। তিনি হেসে বললেন, “আচ্ছা লজ্জার কিছু নেই। আমি ওতো সবকিছু আর বলবো না..”।
আধা ঘন্টা পর দিদি আমাকে ফোন করলেন, শোন ডাক্তার তোমার গাভীর একটা ব্যবস্থা হয়েছে। কাল তুমি হাসপাতালে যাবার আগে আমাদের বাসায় এসো। তোমার স্যার ও থাকবেন।
আমি যথারীতি একটু আগেই বের হলাম। আম্মাকে বললাম দিদিমনির কথা। তিনি বললেন,
ভালোই করেছিস। যা উনাদের কাছে যা। যেভাবে বলেন সেই ভাবে একটা বিহিত করে ফেলিস।
আম্মা স্যারকে চিনতেন। কেননা স্যারের কাছে আমার বড় সব ভাইবোন ই ইংরেজি প্রাইভেট পড়ছেন। আমি পড়েছি। রোজ সকালে স্কুলে যাবার আগে এক ঘন্টা ইংরেজি পড়তাম আমরা ক’জন। স্যারে ইংরেজিতে খুব দক্ষ ছিলেন। খুব সহজ করে ইংরেজী পড়াতেন।
আম্মা বললেন,
“কি সিদ্ধান্ত হয় আমাকে জানাস। তুই ও যে মাঝে মাঝে কি সব করে বসিস”।
সকালে রেডি হয়ে হাসপাতালে যাবার আগে আমি দিদি মনির বাসায় গেলাম। তিনিও আমার সাথে গাভি বিষয়ক মিটিংটা সেরে স্কুলে যাবেন বলে দেখলাম আগেভাগেই রেডি হয়ে বসে অপেক্ষা করছেন।
আমি বললাম, দিদিমনি কি ব্যবস্থা করলেন। আমি তো মহা ক্যাচালে পড়লাম।
তিনি বললেন, শোন আমার গ্রামের বাড়িতে খবর দিয়েছি। সেখানে আমাদের গরু রাখার মানুষ আছে। সে এক্ষুনি এসে পড়বে। তুমি বসো চা খাও।
দিদিরা খুব বনেদী পরিবারের। তার বাবা এক সময় তার গ্রামের জমিদার ছিলেন। আমরা সাথে চা খেতে খেতেই উনাদের গ্রামের বাড়ির রাখাল ছেলেটি চলে আসলো।
তিনি বললেন, রিংকু এসছিস। এতো দেরী কেনো।
না মাসীমা। রাস্তায় ট্যাম্পু পিক আপ কিছু পাইনি। অনেক দূর পর্যন্ত হেঠে এসেছি।তাই দেরী হয়েছে। রিংকু বললো।
দিদি রিংকুকে বিষয়টা খুলে বললেন। এবং এ বিষয়ে তার কাছে দুটো অপশন দিলেন। রিংকু হয় তুমি গাভীটি নিয়ে যাবা দেখা শুনা করবা। দুধ দিবা, বিনিময়ে মাসিক কিছু টাকা পাবা নয়তো তুমি এটাকে কিনে নিবা। কিনলে তিনি যে দাম দিয়ে কিনেছেন ঐদামে কিনে নিবা।
সে একটু ভেবে বললো, মাসিমা আমার কেনার ইচ্ছা আছে। কিন্তু টাকা তো নেই।
ঠিক আছে, সেক্ষেত্রে তোমার জন্যে একটু ছাড় থাকবে।
ও বললো, কি ছাড়।
দিদি বললেন টাকা পরিশোধের ছাড়।
রিংকু একটু ভেবে চিনতে বললো, মাসিমা আপনি যা বলেন।
তিনি বললেন, তাহলে শোন রিংকু, আমি একটা প্রস্তাব দেই। তুমি গাভীটি বরং কিনেই নাও আর দাম পরিশোধ করো দুধ দিয়ে, সময় নিয়ে। তবে দুটো শর্ত আছে এতে। এক, তুমি দুধ দিতে থাকবা দাম পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত। এবং দুধে পানি মিশাবা না । ভগবানের কিরা । আর দ্বিতীয় শর্ত হলো, দুধের দাম পরিশোধ করা না পর্যন্ত মাসে মাসে দুধের দাম আবার বাড়াতে পারবা না। এক দরে দিতে থাকবা। এবং সেটা অবশ্যই বাজার দর থেকে কিছুটা কমদরে হতে হবে।ঠিক আছে।
রিংকু বেশ কিছু সময় ভাবলো।
দিদি বললেন, দেখো ভাবা ভাবি বেশি চলবেনা। গাভীটি কিন্তু সকাল থেকেই উপোষ।
রিংকু রাজী হলো। আমিও দিদির সুন্দর সমাধানে অবাক হলাম। রাজীও হলাম। দিদিকে বললাম, আপনি শিক্ষক না হয়ে ব্যবসায়ী ভালো হতেন। এতো দিনে বিজনেস টাইকুন হয়ে যেতেন।
আম্মাকে বললাম প্রস্তাবটা। আম্মা বললেন, খুবই উত্তম প্রস্তাব।
রিংকু গাভী আর বাছুরটি নিয়ে বাসা থেকে খুশি হয়ে চলে যায়। সে খুব খুশি হয়।
দিদি বললেন, তোমার টেনশন দূর হলোতো ডাক্তার। চলো এক সাথে যাই। পথে তোমার হাসপাতালে নামিয়ে দিবো।
সেই রিংকু দুধ দিয়ে দিয়ে গাভীর দাম পরিশোধ করেছিলো প্রায় দু বছরের বেশি কিছু সময় লেগেছে। খুব বিশ্বস্ততার সাথে, একদিনও পানি মিশায়নি। তার দুধের ছোট খাটো একটা ব্যবসাও ছিলো। শহরের সবার জন্যে একটা কলসিতে দুধ আনতো।আমার জন্যে সে আলাদা একটা বোতলে আনতো। সেই গাভীটিকে সে খুব যত্ন করতো। ওটা পরে আরো দুটো বাছুর দেয়। সেগুলোও বড় হয়।
একদিন সে বলে স্যার, আমার দুবাইর ভিসা হয়েছে। দুটো গরু বিক্রি করে দিচ্ছি। আপনার কাছে ঋণী আমি। আর আমি যাবার পর আমার কাকা আপনাকে দুধ দিবেন। স্যার আপনি গাভীটি দিয়েছিলেন বলেই আজ খুব সহজে আমার টাকার ব্যবস্থা হলো।
আমি বললাম, আরে আমি আর কি করতে পারলাম। সে দুবাই চলে যায়। তারপর থেকেই তার কাকা এই রঞ্জিত দাই আমার বাসায় দুধ দিতে থাকেন।
রঞ্জিতদা একটু বোকা কিসিমের। দুধ বিক্রি করেই চলে তার জীবন সংসার। গ্রামের বাড়ীতে বাড়িতে ঘুরে খুব সকালে দুধ সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলো শহরের বাসায় বিক্রি করেন। আমার বাসায় সেই যে রিংকু যাবার পর থেকে দিচ্ছেন, এখন পর্যন্তও দিচ্ছেন। কাঁধে কলসিতে করে দুধ আনেন। সবার বাসায় দিয়ে দেন। একদিনও বাদ হয় না তার। ঝড় বাদলে ও বাদ হয় না। তবে একবার একমাস দুধ দেয়া বন্ধ রাখেন। আসলে তিনি ইচ্ছে করে সেটা করেন নি।
একদিন সকালে দুধ নিয়ে আসার সময় তার সিএনজি’ টা উলটে যায়। তিনি খুব আঘাত পান। তার নাকের হাড় ভেংগে যায়। তার ছেলেই সে সময় আমাকে ফোন করে। আমি তখন কি কাজে ঢাকা। সে বলে, স্যার, আমি আপনার বাসায় দুধ দেন রঞ্জিত উনার ছেলে বলতেছি। বাবা আজ এক্সিডেন্ট করেছেন। দুধ নিয়ে যাবার পথে সিএনজি টা এক্সিডেন্ট করে। তাকে কুলাউড়া হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বাবা অজ্ঞান, আপনি দেখবেন স্যার। সে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো।
আমার বুকটা ধড়াক করে উঠলো।
সাথে সাথে ফোন দিলাম হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ফোনে। ফোন ধরলো মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট দিজেন্দ্র পাল। অত্যন্ত চৌকশ চিকিৎসা সহকারী। বেশ ট্যালেন্টও। সুযোগ পায়নি। না হলে এতো দিনে সেও বেশ ভালো একজন ডাক্তার হিসেবে নাম করতো।
দিজেন্দ্রকে বললাম, দেখো তো দিজেন্দ্র ওখানে রঞ্জিত নামে কোন এক্সিডেন্টের রোগী আছে কিনা?
সে বললো জ্বী স্যার। আমি দেখছি।
একটু পরে সে বললো। জ্বী স্যার, রঞ্জিত নামে এক দুধ বিক্রেতা আছেন। একটু ডেলিরিয়াম স্টেইজে আছেন। মাথায় আঘাত তো। কেবল “দুধ পড়ে গেলো, দুধ পড়ে গেলো…” বলছেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, তার ইনজুরিটা কি মারাত্মক ?
সে বললো, জ্বী স্যার উনার কপাল কেটে গেছে আর নাকের একটা হাড় ভেংগে গেছে। সিলেট পাঠাতে হবে। কিন্তু সাথে কেউ নেই।
আমি বললাম, আর বাকি জনদের কি অবস্থা। সে বললো উনাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দিয়েছি।
আমি দিজেন্দ্রকে উনার পরিচয় দিয়ে বললাম, আমি সব দেখবো তুমি উনাকে এক্ষুনি যতদূর পারো ডিউটি ডাক্তার সাহেবকে দিয়ে ন্যাজাল প্যাক লাগিয়ে সিলেট ওসমানীতে পাঠানোর ব্যবস্থা করো। এম্বুলেন্স ড্রাইভার কাজল বাবুকে আমার রেফারেন্স দিও।
সে জ্বী স্যার বলে সে ফোন রেখে দিলো।
আমি তাৎক্ষণিক ওসমানীর ইমার্জেন্সীতেও আমার এক কলিগকে ফোনে রেডি রাখলাম।
ওসমানীতে বেশ কিছুদিন থাকতে হয় তাকে। সে যাত্রায় উপরওয়ালা রঞ্জিতদাকে রক্ষা করেন। আর তাই তিনি প্রায়ই দেখা হলে আমাকে আনত মস্তকে বলেন, আপনি না থাকলে আমি মনে হয় মরেই যেতাম।
যাক ফিরে যাই আগের কথায়। এগারোটায় কলিং বেল বাজলো।
আমিই দরজা খুললাম। আমাকে দেখে কিছুটা আঁচ করলো, আমি কি বলবো।
তাকে মোলায়েম গলায় বললাম, দাদা কাল থেকে আর লাগবে না। তুমি আর আসবে না। দুধে কি পানি মিশাও নাকি পানিতে দুধ। এই বলে তার মুখের উপর ধরাস করে দরজা লাগিয়ে দেই।
দু’তিন মাস পর পর এই ভাবে ধরাস করে দরজা লাগানোকে আমার স্ত্রী নাম দিয়েছে ধরাস থেরাপি। তাই তিনিও আমাকে মাঝেমধ্যে মনে করিয়ে দেন, “আজ ধরাস থেরাপি হবে…”। আমিও বুঝে নেই, দুধে পানির পরিমান বাড়তেছে।
আসলে তাকে মাঝে মধ্যে সতর্ক করতে একি ভাবেই গত আট বছর ধরে আমি কয়েক মাস পর পর “কাল থেকে দুধ আর লাগবে না”, বলে বলে তার সামনে ধরাস করে দরজা লাগাই। ওভাবেই চলে যাচ্ছে দিনের পর দিন । বছরের পর বছর রঞ্জিতদা কে আমার ধরাস থেরাপি।
আসলে দুধে পানি মেশাতে হয় অল্প স্বল্প। এটা আমার ফুপু বলতেন। না দুধ খেতে নাকি একটু বেশি মিস্টি মিস্টি লাগে। ফুপুর বাড়িতে অনেক গাভী ছিলো। রাখাল ও ছিলো দু তিনটা। আমি পরীক্ষা শেষ হলে ফুপুর বাড়িই বেশি যেতাম। ফুপু আমাকে খুব আদর করতেন। বলতেন “একেবারে বড় ভাইজানের মতো দেখতে…”। আব্বাকে আবার ফুপুরা খুব ভয় পেতেন। শেষ বয়সে ফুপুর পা ভেংগে যায়। ফ্রাকচার হেড অব ফিমার। বেশি বয়সে যেটা হয়। আমি প্রায়ই যেয়ে যেয়ে চিকিৎসা দিতাম। আমাকে দেখলেই বলতেন, তুই আসছিস। আমি অপেক্ষা করতেছিলাম। ফুপু মারা গেছেন কয়েক বছর হলো।
যাহোক দুধে পানি মিশানোর কারন জানতে একদিন আমি রঞ্জিত’দা কে ডেকে বললাম,
তুমি দুধে পানি মেশাও কেনো রঞ্জিতদা..
তিনি একটু হাসলেন। খুবই সুন্দর হাসি। রঞ্জিতাদা একটু বোকা কিসিমের। বোকা কিসিমের লোক গুলোর হাসি খুব সুন্দর হয়। কোন কপটতা বা ভন্ডামী থাকে না। তিনি হেসে হেসেই বললেন,
“দাদা আপনার সাথে আমি মিথ্যা বলবো না। আপনি আমাকে একদিন রক্ষা করেছেন বড় বিপদ থেকে। বলা যায় আপনি জীবন দিয়েছেন। আপনি বলায় ডাক্তাররা আমাকে কি যে করেন। যাকগে দাদা, দুধে সবাই পানি মেশায়। অল্প পানি না মেশালে দুধ আঠা আঠা করে। আর আমার ও আসলে পুষে না। আপনারা কয়েক পরিবার আছেন যাদের কাছে বিক্রি করেই মুলত আমার অল্প লাভ হয়। বাকীদের কাছে ওরকম হয় না। প্রায় কেনা দামেই উনাদের দিয়ে দেই। ফেরত তো আর নেয়া যায় না। দুধ নস্ট হয়ে যায়। দাদা সারাদিন ঘাড়ে কলসি নিয়ে দুধ বিক্রি করে দাদা গড়ে দিনে দুই বা আড়াইশো টাকা লাভ হয়। ওতেই আমার সংসার চলে। সেই খুব ভোরে আজানের সময় উঠি। তারপর বাড়ি বাড়ি যেয়ে দুধ কিনি। প্রায় বিশ লিটার দুধ প্রতিদিন কিনি। খুব একটা পানি মিশাইনা। নিজের খারাপ লাগে, বেশি মিশাতে। কিন্তু কি করবো। দিনে যদি দুই আড়াইশো টাকা না হয় তাহলে তো বউ বাচ্চা সবাই না খেয়ে মরবে। গরীবের সংসার। একটি ছেলে আছে সেও জন্ম থেকে ভালো করে হাটতে পারে না। আর তিন জন মেয়ে আছে। সবাই স্কুলে যায়। আমার উপর ই সব। তার চোখ দিয়ে অশ্রু বেয়ে পড়ছিলো।
আমার একটু খারাপ লাগলো। মনে মনে বললাম,
“..রঞ্জিত’দা তুমি দুধে আরেকটু বেশি পানি মিশিয়ো, আমি আর কখনো তোমার সামনে ধড়াস করে দরজা লাগাবো না। আর দেখি পারিতো তোমাকে একটি গাভী কিনে দিবো….
আমি তাই লেখালেখির ভাবনা রেখে বসে বসে রঞ্জিতের অপেক্ষা করছিলাম। আজ ব্যাটাকে একটা ঝাঁকুনি দিতে হবে। মাঝে মধ্যে কয়েক মাস পর পর ওকে একটা ঝাকুনি দিতে হয়। ওতেই কাজ হয়ে যায়। পানির পরিমান প্রমান মাত্রায় চলে আসে। তাই এগারোটা বাজার অপেক্ষা করছিলাম। ও রোজ এগারোটায় আসে।
জাস্ট এগারোটায় কলিং বেল টিপার শব্দ হলে আমি বুঝলাম ও এসেছে দুধ নিয়ে। দরজার ওপাশ সে তার স্বভাব সুলভ জোরে জোরে ডাক পাড়ে ,
” দুধ দুধ, আফ্রিদা মা’মনি কই। কই আমার ছোট রানী মা…”।
আমার ছোট মেয়ে আফ্রিদা দৌড়ে যায় দুধের বোতল আনতে। আমার বড় মেয়েটা যখন ছোট ছিলো তখন সেই আনতো দুধ রঞ্জিত এর কাছ থেকে। এরপর এ দায়িত্ব পড়ে ছেলে আদিয়ানের উপর। আফ্রিদা আদিয়ান প্রায় সমবয়সী। তাই এখন পালাক্রমে একদিন ছোট মেয়ে আফ্রিদাকে রঞ্জিত দা ডাকেন। আরেকদিন ডাকেন আদিয়ানকে। আদিয়ানকে আবার একটু স্টাইল করে ডাকতে হয়ে। নাহলে যায়না। রঞ্জিতদা তাই একটু স্টাইল করেন। “…কই রাজপুত্র আদিয়ান সাহেব”। আদিয়ানকে আবার “সাহেব” বলতে হয়। মাঝে মাধ্যে তাকে আবার “ছোট ডাক্তার” বলে ডাকেন রঞ্জিত দা। “কই আমার ছোট ডাক্তার সাহেব”। আদিয়ান দৌড়ে যায়। আজ দুজনকেই বারণ করা আছে। কারণ আজ ধরাস করে ধরাশায়ী করা হবে রঞ্জিত দাকে।
এই রঞ্জিতদা অনেক আগে থেকেই আমার বাসায় দুধ দেন। প্রায় সাত কি আট বছর হবে। তার আগে আমার বাসায় দুধ দিতো রিংকু নামের একটি ছেলে। সম্পর্কে রঞ্জিতের ভাইপো।
রিংকুর আমার বাসায় দুধ দেবার ছোট একটা কাহিনী আছে। নতুন পোস্টিং, নতুন চেম্বার। মফস্বল থেকে একটু দূরে। একদিন চেম্বার থেকে ফিরছি। পাশেই রাস্তায় একটা গরুর হাট চলছিলো। ভাবলাম যাই একটু ঢু মেরে আসি। অচেনা আপরিচিত জায়গায় ঢু মেরে টুকটাক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নেয়ার অভ্যাসটা আমার সেই হোস্টেল জীবনের। একদিন আইটেম (মেডিকেলের ভাইবা পরীক্ষা) শেষ করে সন্ধ্যায় বসি আছি। আইটেমটা একটু বড় ছিলো, এনাটমির এবডোমেন। এ সময় হঠাৎ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেলের হোস্টেল থেকে ফোন করলো জাহাঙ্গীর ,
“বন্ধু কই…”?
আমি বললাম এইতো হোস্টেলে। আমি তখন ঢাকা মেডিকেল ফজলে রাব্বি হোস্টেলের মেইন বিল্ডিং এর ১৩০ নাম্বার রুমে থাকতাম। তার ছাদে বসে আছি। জাহাংগীর বলল, যাবে নাকি ঘুরতে নৌকা দিয়ে বুড়িগংগায়, আজ কি সুন্দর পুর্নিমা।
আমি বললাম, যাবো না মানে আলবৎ যাবো। তুই ব্যবস্থা কর আমি আসছি।
ব্যাস আর কথা নাই। রাত ১২টা পর্যন্ত কয়েকজন বন্ধু মিলে নৌকা দিয়ে ঘুরাঘুরি আর বেসুরো গলায় গান গাইতে থাকতাম। যাইহোক এ রকমই টাইমে বেটাইমে অদ্ভুত রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কিছু বদঅভ্যাস নেয়ার বাতিক ছিলো আমাদের কয়েকটা সহপাঠীর মধ্যে।
তো যে কথায় ছিলাম, আমি রাস্তার পাশে গরুর হাটে ঢুকে দেখছি গরুর হাট। সারি সারি অনেকগুলো গরু। লাল কালো সাদা কোনটা আবার কালো সাদা মিক্সড। নানান রঙ এর, নানান ঢং এর। এসময় দেখলাম এক বৃদ্ধ লোক একটি গাভী বাছুরসহ বিক্রি করবে বলে হাটে তুলেছেন। টকটকে লাল সুঠাম গাভী। সাথে বাছুরও একটা। ওটা একটু কালচে ধাচের । কপালে তার আবার সুন্দর একটা সাদা টিকা। বাছুর টি ছুটোছুটি করছে, এদিক ওদিক। মনে হচ্ছে হাটে এসে তার খুব ভালো লাগছে। কখনো দৌড়ে যাচ্ছে এ থেকে ঐ মাথা। এতো সুন্দর একটা দৃশ্য। আমার খুব ভালো লাগে বাছুর সমেত গাভীটিকে।
যিনি হাটে তুলেছেন সেই বৃদ্ধকে বললাম কি ব্যাপার, চাচা মিয়া এতোদিন পুষলেন, বড় করলেন, এখন দুধ খাবার সময় এলো। এখন কেনো বিক্রি করে দিবেন?
তিনি বললেন, তার ছেলের ভিসা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে। জরুরী ভিত্তিতে টাকার প্রয়োজন। না হলে ভিসা ক্যানসেল হয়ে যাবে। তাই অনিচ্ছা স্বত্বেও বিক্রি করে দিচ্ছেন।
তার চোখে ভালো এবং মন্দ দুই ধরনের অশ্রু খেলা করছিলো কথাগুলো বলতে যেয়া। আমি খেয়াল করলাম এটি। একদিকে অতি প্রিয় বাছুর সমেত গাভী, অন্য দিকে ছেলের বিদেশ যাত্রা।
আমি বললাম, দাম কতো। তিনি বললেন, ত্রিশ হাজার। তবে আপনি ডাক্তার সাব আপনার জন্যে একটু কম আছে। আপনাকে আমি চিনি।
আমি বললাম, আমার খুব পছন্দ হয়েছে, তা কতো হলে ছেড়ে দিবেন।
তিনি এদিক ওদিক তাকিয়ে কানে কানে ফিস ফিস করে বললেন, আঠাশ হলে কাফি।
ভাবলাম মন্দ না, নগদ ফ্রেস দুধ পাওয়া যাবে। বিশেষ করে আম্মার জন্যে ভালো হবে। যথেস্ট বয়স হয়েছে উনার। উনার উপকারই বেশি হবে। এ বয়সে তার ফ্রেস খাবার দাবার প্রয়োজন। তাই আর আমি আগ পিছ না ভেবে বললাম, চাচা মিয়া সবই ঠিক, কিন্ত এতো টাকাতো সাথে নাই। চেম্বার থেকে মাত্র আসছি…।
আসলে সে সময় পকেটে এতো টাকা থাকার কথা না। নতুন ডাক্তার। মাত্র জয়েন করেছি গ্রামের সাব সেন্টারে। টুক টাক চেম্বার শুরু করেছি। ওদিয়ে চলি আর বেতনের টাকা জমাই পোস্ট গ্রাজুয়েশন-এর সময়কালীনের জন্যে। কারণ সে সময় চেম্বার করা যায় না। যাকগে, নতুন চেম্বার, একদিন চেম্বার করলে আর কতই বা হবে। দু’তিন হাজার বড়জোর। ওদিয়ে তো এখন আর স্বাধ পুরন হচ্ছে না।
তিনি বললেন, অসুবিধা নাই ডাক্তার সাব। আমি চিনি আপনাকে। আপনার পছন্দ হলে বলেন, আমি বাসায় দিয়ে আসবো। তখন টাকা দিয়েন।
আমি গাভীটার দিকে আবার তাকালাম। খুবই সুন্দর। আর সাথের বাচ্চাটাও বেশ। বললাম, ঠিক আছে। চলে আসেন নিয়ে।
বাসায় এসেতো পড়লাম মহা বিপত্তিতে। আম্মা বললেন,
করেছিস কি এটা।
আমি বললাম, আম্মা খুব মায়া লাগছিলো গাভি আর বাছুরকে। তাছাড়া ভাবলাম তোমারও বয়স হয়েছে, এখন একটু ভালো ফ্রেস খাবার, দুধ ডিম এগুলো খাওয়া দরকার। বাজারের দুধগুলো কি আর দুধ, সব কেমিক্যাল মেশানো।
তিনি বললেন, তাই বলে আস্ত একটা গাভী। আর এটা কিনলেই হলো। এটাকে খাওয়াবি কি, দেখাশুনো করবে কে, যত্ন করবে কে, এটার জন্যে আলাদা ঘর লাগবে, ঘাস লাগবে। এটা তুই কি করেছিস। তাছাড়া শহরে কেউ কি গাভি পোষে। যা যা ফেরৎ পাঠা।
আম্মার কথায় আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম। সত্যি তাইতো। ভীষণ একটা ইমোশনাল কাজ করে ফেলেছি। সত্যিই তো দুধেল গাভী আর বাছুরের অনেক যত্ন করতে হয়। খাওয়াতে হয়। তবেই না খাঁটি দুধ।
কিন্তু ফেরত দিতে মনটা একদম সায় দিলো না। গাভীর গায়ে একটু হাত বুলালাম। সে ও তার জিহবা দিয়ে আমার হাতটা একটু চেটে দিলো।
গৃহপালিত পশু গরু ছাগল, বিড়াল এগুলো খুব আদর বুঝে। ছোট বাছুরটাও ইতিমধ্যে ছুটোছুটি শুরু করে দিয়েছে করছে বাসার ভিতর এমাথা থেকে ওমাথা। যেনো তার খুব পরিচিত।
কি করা যায় ভাবতা ভাবতে হঠাৎ মীরা দিদি মনির কথা মনে পড়লো। মীরা দিদি আমার প্রতিবেশী। আমার সাবসেন্টারের পাশে উনার স্কুল ছিলো। আসতে যেতে প্রায়শই উনার সাথে দেখা হতো। তাছাড়া দিদির স্বামী ছিলেন আমাদের ছেলে বেলার হাই স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক। আমার প্রাইভেট টিচার।
দিদিকে ফোন দিলাম, দিদি একটা ভুল করে ফেলেছি।
কি ভুল ডাক্তার সাব?
দিদি একটা গাভী কিনে ফেলেছি বাছুরসহ। আসলে এতো মায়া লাগছিলো, তাছাড়া ভাবলাম আম্মার বয়স হয়েছে, এ বয়সে ফ্রেস দুধ মধু এগুলো বেশি বেশি উনার খাওয়া উচিৎ …,
তিনি ওপাশ থেকে কথা শেষ হবার আগেই হো হো করে হেসে উঠলেন।
“এইটা তুমি কি করছো সাঈদ..”।
“জ্বী দিদি। করেই তো ফেলেছি। এখন কি করবো ঐটা বলেন। হাসি রাখেন”।
দিদি হাসি থামাতে পারছেন না। বললেন, “দাঁড়াও তোমাদের স্যারের সাথে একটু আলাপ করে নেই। তোমাকে বোকা জানতাম, কেবল ডাক্তারি বুঝো, তবে এতোটা যে বোকা, সেটা জানতাম না। চিন্তা করো না। মাসীকেও বলো চিন্তা না করতে। আমি একটা উপায় বের করছি, তোমার স্যারের সাথে আলাপ করে..”।
আমি খুশি হয়ে বললাম, “প্লিজ দিদিমিনি একটা কিছু করেন। আর স্যারকে ডিটেইল কিছু বলবেন না। স্যার আবার কিনা কি বলেন”। তিনি হেসে বললেন, “আচ্ছা লজ্জার কিছু নেই। আমি ওতো সবকিছু আর বলবো না..”।
আধা ঘন্টা পর দিদি আমাকে ফোন করলেন, শোন ডাক্তার তোমার গাভীর একটা ব্যবস্থা হয়েছে। কাল তুমি হাসপাতালে যাবার আগে আমাদের বাসায় এসো। তোমার স্যার ও থাকবেন।
আমি যথারীতি একটু আগেই বের হলাম। আম্মাকে বললাম দিদিমনির কথা। তিনি বললেন,
ভালোই করেছিস। যা উনাদের কাছে যা। যেভাবে বলেন সেই ভাবে একটা বিহিত করে ফেলিস।
আম্মা স্যারকে চিনতেন। কেননা স্যারের কাছে আমার বড় সব ভাইবোন ই ইংরেজি প্রাইভেট পড়ছেন। আমি পড়েছি। রোজ সকালে স্কুলে যাবার আগে এক ঘন্টা ইংরেজি পড়তাম আমরা ক’জন। স্যারে ইংরেজিতে খুব দক্ষ ছিলেন। খুব সহজ করে ইংরেজী পড়াতেন।
আম্মা বললেন,
“কি সিদ্ধান্ত হয় আমাকে জানাস। তুই ও যে মাঝে মাঝে কি সব করে বসিস”।
সকালে রেডি হয়ে হাসপাতালে যাবার আগে আমি দিদি মনির বাসায় গেলাম। তিনিও আমার সাথে গাভি বিষয়ক মিটিংটা সেরে স্কুলে যাবেন বলে দেখলাম আগেভাগেই রেডি হয়ে বসে অপেক্ষা করছেন।
আমি বললাম, দিদিমনি কি ব্যবস্থা করলেন। আমি তো মহা ক্যাচালে পড়লাম।
তিনি বললেন, শোন আমার গ্রামের বাড়িতে খবর দিয়েছি। সেখানে আমাদের গরু রাখার মানুষ আছে। সে এক্ষুনি এসে পড়বে। তুমি বসো চা খাও।
দিদিরা খুব বনেদী পরিবারের। তার বাবা এক সময় তার গ্রামের জমিদার ছিলেন। আমরা সাথে চা খেতে খেতেই উনাদের গ্রামের বাড়ির রাখাল ছেলেটি চলে আসলো।
তিনি বললেন, রিংকু এসছিস। এতো দেরী কেনো।
না মাসীমা। রাস্তায় ট্যাম্পু পিক আপ কিছু পাইনি। অনেক দূর পর্যন্ত হেঠে এসেছি।তাই দেরী হয়েছে। রিংকু বললো।
দিদি রিংকুকে বিষয়টা খুলে বললেন। এবং এ বিষয়ে তার কাছে দুটো অপশন দিলেন। রিংকু হয় তুমি গাভীটি নিয়ে যাবা দেখা শুনা করবা। দুধ দিবা, বিনিময়ে মাসিক কিছু টাকা পাবা নয়তো তুমি এটাকে কিনে নিবা। কিনলে তিনি যে দাম দিয়ে কিনেছেন ঐদামে কিনে নিবা।
সে একটু ভেবে বললো, মাসিমা আমার কেনার ইচ্ছা আছে। কিন্তু টাকা তো নেই।
ঠিক আছে, সেক্ষেত্রে তোমার জন্যে একটু ছাড় থাকবে।
ও বললো, কি ছাড়।
দিদি বললেন টাকা পরিশোধের ছাড়।
রিংকু একটু ভেবে চিনতে বললো, মাসিমা আপনি যা বলেন।
তিনি বললেন, তাহলে শোন রিংকু, আমি একটা প্রস্তাব দেই। তুমি গাভীটি বরং কিনেই নাও আর দাম পরিশোধ করো দুধ দিয়ে, সময় নিয়ে। তবে দুটো শর্ত আছে এতে। এক, তুমি দুধ দিতে থাকবা দাম পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত। এবং দুধে পানি মিশাবা না । ভগবানের কিরা । আর দ্বিতীয় শর্ত হলো, দুধের দাম পরিশোধ করা না পর্যন্ত মাসে মাসে দুধের দাম আবার বাড়াতে পারবা না। এক দরে দিতে থাকবা। এবং সেটা অবশ্যই বাজার দর থেকে কিছুটা কমদরে হতে হবে।ঠিক আছে।
রিংকু বেশ কিছু সময় ভাবলো।
দিদি বললেন, দেখো ভাবা ভাবি বেশি চলবেনা। গাভীটি কিন্তু সকাল থেকেই উপোষ।
রিংকু রাজী হলো। আমিও দিদির সুন্দর সমাধানে অবাক হলাম। রাজীও হলাম। দিদিকে বললাম, আপনি শিক্ষক না হয়ে ব্যবসায়ী ভালো হতেন। এতো দিনে বিজনেস টাইকুন হয়ে যেতেন।
আম্মাকে বললাম প্রস্তাবটা। আম্মা বললেন, খুবই উত্তম প্রস্তাব।
রিংকু গাভী আর বাছুরটি নিয়ে বাসা থেকে খুশি হয়ে চলে যায়। সে খুব খুশি হয়।
দিদি বললেন, তোমার টেনশন দূর হলোতো ডাক্তার। চলো এক সাথে যাই। পথে তোমার হাসপাতালে নামিয়ে দিবো।
সেই রিংকু দুধ দিয়ে দিয়ে গাভীর দাম পরিশোধ করেছিলো প্রায় দু বছরের বেশি কিছু সময় লেগেছে। খুব বিশ্বস্ততার সাথে, একদিনও পানি মিশায়নি। তার দুধের ছোট খাটো একটা ব্যবসাও ছিলো। শহরের সবার জন্যে একটা কলসিতে দুধ আনতো।আমার জন্যে সে আলাদা একটা বোতলে আনতো। সেই গাভীটিকে সে খুব যত্ন করতো। ওটা পরে আরো দুটো বাছুর দেয়। সেগুলোও বড় হয়।
একদিন সে বলে স্যার, আমার দুবাইর ভিসা হয়েছে। দুটো গরু বিক্রি করে দিচ্ছি। আপনার কাছে ঋণী আমি। আর আমি যাবার পর আমার কাকা আপনাকে দুধ দিবেন। স্যার আপনি গাভীটি দিয়েছিলেন বলেই আজ খুব সহজে আমার টাকার ব্যবস্থা হলো।
আমি বললাম, আরে আমি আর কি করতে পারলাম। সে দুবাই চলে যায়। তারপর থেকেই তার কাকা এই রঞ্জিত দাই আমার বাসায় দুধ দিতে থাকেন।
রঞ্জিতদা একটু বোকা কিসিমের। দুধ বিক্রি করেই চলে তার জীবন সংসার। গ্রামের বাড়ীতে বাড়িতে ঘুরে খুব সকালে দুধ সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলো শহরের বাসায় বিক্রি করেন। আমার বাসায় সেই যে রিংকু যাবার পর থেকে দিচ্ছেন, এখন পর্যন্তও দিচ্ছেন। কাঁধে কলসিতে করে দুধ আনেন। সবার বাসায় দিয়ে দেন। একদিনও বাদ হয় না তার। ঝড় বাদলে ও বাদ হয় না। তবে একবার একমাস দুধ দেয়া বন্ধ রাখেন। আসলে তিনি ইচ্ছে করে সেটা করেন নি।
একদিন সকালে দুধ নিয়ে আসার সময় তার সিএনজি’ টা উলটে যায়। তিনি খুব আঘাত পান। তার নাকের হাড় ভেংগে যায়। তার ছেলেই সে সময় আমাকে ফোন করে। আমি তখন কি কাজে ঢাকা। সে বলে, স্যার, আমি আপনার বাসায় দুধ দেন রঞ্জিত উনার ছেলে বলতেছি। বাবা আজ এক্সিডেন্ট করেছেন। দুধ নিয়ে যাবার পথে সিএনজি টা এক্সিডেন্ট করে। তাকে কুলাউড়া হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বাবা অজ্ঞান, আপনি দেখবেন স্যার। সে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো।
আমার বুকটা ধড়াক করে উঠলো।
সাথে সাথে ফোন দিলাম হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ফোনে। ফোন ধরলো মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট দিজেন্দ্র পাল। অত্যন্ত চৌকশ চিকিৎসা সহকারী। বেশ ট্যালেন্টও। সুযোগ পায়নি। না হলে এতো দিনে সেও বেশ ভালো একজন ডাক্তার হিসেবে নাম করতো।
দিজেন্দ্রকে বললাম, দেখো তো দিজেন্দ্র ওখানে রঞ্জিত নামে কোন এক্সিডেন্টের রোগী আছে কিনা?
সে বললো জ্বী স্যার। আমি দেখছি।
একটু পরে সে বললো। জ্বী স্যার, রঞ্জিত নামে এক দুধ বিক্রেতা আছেন। একটু ডেলিরিয়াম স্টেইজে আছেন। মাথায় আঘাত তো। কেবল “দুধ পড়ে গেলো, দুধ পড়ে গেলো…” বলছেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, তার ইনজুরিটা কি মারাত্মক ?
সে বললো, জ্বী স্যার উনার কপাল কেটে গেছে আর নাকের একটা হাড় ভেংগে গেছে। সিলেট পাঠাতে হবে। কিন্তু সাথে কেউ নেই।
আমি বললাম, আর বাকি জনদের কি অবস্থা। সে বললো উনাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দিয়েছি।
আমি দিজেন্দ্রকে উনার পরিচয় দিয়ে বললাম, আমি সব দেখবো তুমি উনাকে এক্ষুনি যতদূর পারো ডিউটি ডাক্তার সাহেবকে দিয়ে ন্যাজাল প্যাক লাগিয়ে সিলেট ওসমানীতে পাঠানোর ব্যবস্থা করো। এম্বুলেন্স ড্রাইভার কাজল বাবুকে আমার রেফারেন্স দিও।
সে জ্বী স্যার বলে সে ফোন রেখে দিলো।
আমি তাৎক্ষণিক ওসমানীর ইমার্জেন্সীতেও আমার এক কলিগকে ফোনে রেডি রাখলাম।
ওসমানীতে বেশ কিছুদিন থাকতে হয় তাকে। সে যাত্রায় উপরওয়ালা রঞ্জিতদাকে রক্ষা করেন। আর তাই তিনি প্রায়ই দেখা হলে আমাকে আনত মস্তকে বলেন, আপনি না থাকলে আমি মনে হয় মরেই যেতাম।
যাক ফিরে যাই আগের কথায়। এগারোটায় কলিং বেল বাজলো।
আমিই দরজা খুললাম। আমাকে দেখে কিছুটা আঁচ করলো, আমি কি বলবো।
তাকে মোলায়েম গলায় বললাম, দাদা কাল থেকে আর লাগবে না। তুমি আর আসবে না। দুধে কি পানি মিশাও নাকি পানিতে দুধ। এই বলে তার মুখের উপর ধরাস করে দরজা লাগিয়ে দেই।
দু’তিন মাস পর পর এই ভাবে ধরাস করে দরজা লাগানোকে আমার স্ত্রী নাম দিয়েছে ধরাস থেরাপি। তাই তিনিও আমাকে মাঝেমধ্যে মনে করিয়ে দেন, “আজ ধরাস থেরাপি হবে…”। আমিও বুঝে নেই, দুধে পানির পরিমান বাড়তেছে।
আসলে তাকে মাঝে মধ্যে সতর্ক করতে একি ভাবেই গত আট বছর ধরে আমি কয়েক মাস পর পর “কাল থেকে দুধ আর লাগবে না”, বলে বলে তার সামনে ধরাস করে দরজা লাগাই। ওভাবেই চলে যাচ্ছে দিনের পর দিন । বছরের পর বছর রঞ্জিতদা কে আমার ধরাস থেরাপি।
আসলে দুধে পানি মেশাতে হয় অল্প স্বল্প। এটা আমার ফুপু বলতেন। না দুধ খেতে নাকি একটু বেশি মিস্টি মিস্টি লাগে। ফুপুর বাড়িতে অনেক গাভী ছিলো। রাখাল ও ছিলো দু তিনটা। আমি পরীক্ষা শেষ হলে ফুপুর বাড়িই বেশি যেতাম। ফুপু আমাকে খুব আদর করতেন। বলতেন “একেবারে বড় ভাইজানের মতো দেখতে…”। আব্বাকে আবার ফুপুরা খুব ভয় পেতেন। শেষ বয়সে ফুপুর পা ভেংগে যায়। ফ্রাকচার হেড অব ফিমার। বেশি বয়সে যেটা হয়। আমি প্রায়ই যেয়ে যেয়ে চিকিৎসা দিতাম। আমাকে দেখলেই বলতেন, তুই আসছিস। আমি অপেক্ষা করতেছিলাম। ফুপু মারা গেছেন কয়েক বছর হলো।
যাহোক দুধে পানি মিশানোর কারন জানতে একদিন আমি রঞ্জিত’দা কে ডেকে বললাম,
তুমি দুধে পানি মেশাও কেনো রঞ্জিতদা..
তিনি একটু হাসলেন। খুবই সুন্দর হাসি। রঞ্জিতাদা একটু বোকা কিসিমের। বোকা কিসিমের লোক গুলোর হাসি খুব সুন্দর হয়। কোন কপটতা বা ভন্ডামী থাকে না। তিনি হেসে হেসেই বললেন,
“দাদা আপনার সাথে আমি মিথ্যা বলবো না। আপনি আমাকে একদিন রক্ষা করেছেন বড় বিপদ থেকে। বলা যায় আপনি জীবন দিয়েছেন। আপনি বলায় ডাক্তাররা আমাকে কি যে করেন। যাকগে দাদা, দুধে সবাই পানি মেশায়। অল্প পানি না মেশালে দুধ আঠা আঠা করে। আর আমার ও আসলে পুষে না। আপনারা কয়েক পরিবার আছেন যাদের কাছে বিক্রি করেই মুলত আমার অল্প লাভ হয়। বাকীদের কাছে ওরকম হয় না। প্রায় কেনা দামেই উনাদের দিয়ে দেই। ফেরত তো আর নেয়া যায় না। দুধ নস্ট হয়ে যায়। দাদা সারাদিন ঘাড়ে কলসি নিয়ে দুধ বিক্রি করে দাদা গড়ে দিনে দুই বা আড়াইশো টাকা লাভ হয়। ওতেই আমার সংসার চলে। সেই খুব ভোরে আজানের সময় উঠি। তারপর বাড়ি বাড়ি যেয়ে দুধ কিনি। প্রায় বিশ লিটার দুধ প্রতিদিন কিনি। খুব একটা পানি মিশাইনা। নিজের খারাপ লাগে, বেশি মিশাতে। কিন্তু কি করবো। দিনে যদি দুই আড়াইশো টাকা না হয় তাহলে তো বউ বাচ্চা সবাই না খেয়ে মরবে। গরীবের সংসার। একটি ছেলে আছে সেও জন্ম থেকে ভালো করে হাটতে পারে না। আর তিন জন মেয়ে আছে। সবাই স্কুলে যায়। আমার উপর ই সব। তার চোখ দিয়ে অশ্রু বেয়ে পড়ছিলো।
আমার একটু খারাপ লাগলো। মনে মনে বললাম,
“..রঞ্জিত’দা তুমি দুধে আরেকটু বেশি পানি মিশিয়ো, আমি আর কখনো তোমার সামনে ধড়াস করে দরজা লাগাবো না। আর দেখি পারিতো তোমাকে একটি গাভী কিনে দিবো….
লেখক: ডা. সাঈদ এনাম ।
এম.বি.বি.এস (ডি এম সি) এম ফিল (সাইকিয়াট্রি) সাইকিয়াট্রিস্ট ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, সিলেট।

