ডা. সাঈদ এনাম: বিছানায়
শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম "চিকনগুনিয়া জ্বর" নিয়ে লিখবো, এটা রাজধানী তে বেশ
আতংকের জন্ম দিয়েছে। আসলে চিকনগুনিয়া খুব একটা মারাত্মক কোন রোগ নয়। এটি
একটি ভাইরাস ঘটিত রোগ যাতে থাকে তীব্র জ্বর আর জোড়ায় জোড়ায় ব্যথা।
মাথাব্যথা ও থাকে, সাথে সারা গায়ে লালচে ছোট ছোট দানা। এক বার হলে লাইফলং
ইমিউনিটি পায় শরীর। তখন আর হয়না। মশা দিয়ে ছড়িয়ে পড়া এ রোগে প্রতি এক হাজার
জনে একজনের অবস্থা খারাপ হতে পারে।
কিন্তু
কিভাবে লিখবো চিন্তা করে পাচ্ছিলাম না। প্রবন্ধ, ছোট গল্প, উপন্যাস নাকি
কবিতা। ছোট গল্প বা উপন্যাসে তো সমস্যা হয়ে যায়। কিছু কিছু পাঠক অভিযোগ করে
আমার লেখায় হুমায়ুন আহমেদ "আছর করে" ।
লেখায়
আছর পড়া একটা স্বাভাবিক ঘঠনা। কালোত্তীর্ণ সকল কবি উপন্যাসিক দের লেখা
দেখলে বুঝা যায় তাদের লেখাতে সমসাময়িক বা অগ্রজ দের ভালো লেখনির একটা আবছা
আছর রয়েছে। আমার লেখা গুলোতে ও কি হুমায়ুন হুমায়ুন স্মেল পাওয়া যায় ।
জানিনা। আসলে আমি যখন লিখি তখন ডায়েরী লেখার মত লিখি। জাস্ট নিজের ভাবনা
গুলো লিখি। ভাবছি আর লিখছি। প্রেজেন্ট কন্টিনিউয়াস টেনস বলা যায় আর কি।
সে
যাই হোক হুমায়ুন আহমেদ ভুতপূর্ব। অনেকে রস মেখে ভুতপুর্ব কে বলে, যিনি
বহুকাল পূর্বে মরে ভুত হয়ে গেছেন তিনিই ভুতপুর্ব। আচ্চা সেই ভুতপুর্ব একজন
লেখকের লেখার আছর আমার লেখায় কেমনে পড়বে বুঝিনা। তবে হিমু বা মিসির আলি
ভুতপূর্ব না। ওরা বেচে আছে।
মিসির
আলিকে একদিন জিজ্ঞেস করতে হবে, "এই মিসির কোথায় যাও। নাও আমার এই লেখাটি
পড়ো। পড়ে দেখতো সত্যি আমার লেখায় হুমায়ুনের আছর পড়ে কিনা। দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে ই
পড়ো। মিসির আলি দাঁড়িয়ে পড়ার ভান করবে"। না পড়েই বলবে,
"না টটা টা এডডম টিট না"।
(না ককথাটা একদম ঠিকনা)।
তার
গাল ভর্তি পান, সেজন্যে পরিষ্কার করে বলতেও পারছেনা। তবে খুশী করার জন্য
বলার চেষ্টা করছে। পান খাওয়া অবস্থায় মানুষ এভাবেই "ট" আর "ড" দিয়ে কথা
বলে।
মিসির
আলিকে আমি মাঝেমধ্যে ময়লা কাপড় পড়ে গলির মোড়ে টং দোকানে বসে পান চিবাতে
দেখি। বেশি করে চুন আর জর্দা মিশিয়ে পান খায়। ঠোট লাল করে পান খায়। ঠোট
দেখে মনে হয় লাল রং এর লিপিস্টিক লাগানোর শখ ছিলো, কিন্তু লজ্জায় লিপস্টিক
লাগায় নি। তাই কি আর করা পান দিয়ে লিপস্টিকের কাম সারে। তবে ইদানীং
বাংলাদেশের চ্যানেল গুলোর সংবাদ পাঠক দের দেখলে মনে হয় ছেলেদের ও লিপস্টিক
লাগানোর যুগ চলে এসেছে। ওদের কে প্রায়শ লাল নীল কমলা, হরেক রকমের লিপস্টিক
লাগিয়ে খবর পড়তে দেখা যায়। বি বি সি, সি এন এন এর পুরুষ সংবাদ পাঠকদের ও
একই অবস্থা। তবে লিপস্টিক গুলোর "রং" আর তাদের "চেহারা" দেখে বুঝা যায়
পুরুষ দের লিপস্টিক গুলো দামে কম।
কমদামী
লিপস্টিক গুলা ঠোটে লেপ্টে যায়। মেয়েরা তাই কমদামী লিপস্টিক কিনে না। টাকা
পয়সা জমিয়ে একটু বেশি দামের টা কিনতে চায়। যেমন রেভলন, ল'রেল ইত্যাদি
কিসব। বেশি দামী লিপস্টিক) লেপ্টে যায় না বা মুছে যায়না। কফি বা চা খেলেও
মুছে যায় না।
তবে
যতই মুছে যাক বা না যাক মেয়েরা লিপস্টিক লাগানোর পর আর কিছু তেমন একটা
খায়না। খেতে বললে বলে, "গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা এখন খাবোনা"। আসলে
গ্যাস্ট্রিক জাতিয় কিছু না, লিপস্টিক মুছে যাবার সমস্যা।
যাকগে
মিসির আলি গলির টং দোকান থেকে যখন পান কিনে তখন হাতের আংগুলের আগায় কিছু
চুন নিয়ে রাখে। অত:পর যখন প্রয়োজন তখন আস্তে করে টকটকে লাল জিহবা বের করে।
তার পর সেই লাল জিহবার আগায় যত্ন করে চুন লাগায় মিসির আলি। জিহবায় চুন
লাগানোর ব্যাপার টা মনে হয় তার কাছে খুব মজার। চুন সমেত পান চাবানোর ভঙ্গি
দেখে লাগে সে পান না যেনো অমৃত চিবাচ্ছে ।
জিহবায়
চুন লাগানো পর আংগুলে যদি কিছু চুন অবশিষ্ট থাকে তবে সেটা আবার বাংলা
সিনেমার পোস্টারের জন্য জমিয়ে রেখে দেয় সে। ধারে কাছে যদি কোন বাংলা
ছিনেমার পোস্টার পায় তাইলে এদিক ওদিক তাকিয়ে টুপ করে সেই পোস্টারের নায়িকার
গালে চুনটা মুছে দেয়। অদ্ভুত বিষয়। বাংলাদেশের সিনেমার পোস্টারে যদি কারো
দৈবাৎ চোখ যায় দেখা যায় সেখানে দেখবেন সব পোস্টারের নায়িকার গালে একটু আধটু
চুন লেপ্টে আছে।
চুন
লেপ্টে দেবার পর একটু দূরে যেয়ে হঠাৎ "পিচিত" করে কোন দেয়ালে লাল রং এর
পিক ফেলে দেয় মিসির আলি । দেয়ালে কেনো যে পিক ফালায় সে বুঝিনা । আচ্চা
দেয়ালে কি লেখা থাকে দেখিবা মাত্র পানের পিক ফালাবেন, টাকায় যেমনি লেখা
থাকে
"চাহিবা মাত্র দিতে বাধ্য
থাকিবেন"। তবে চুনের কথা লেখা থাক বা না থাক রাস্তার পাশে সকল দেয়ালে একটি
কথা লেখা থাকে, "এখানে প্রস্রাব করিবেন না। করিলে পঞ্চাশ টাকা জরিমানা"।
কিন্তু
যারা প্রস্রাব করে ওরা খুব চালাক। তারাতো এটা মানেই না বরং তারা "না"
শব্দের পরে যে দাড়ি চিহ্ন থাকে ওটা সযত্নে কেটে দেয়। কেটে "না" এর আগে একটা
কমা চিহ্ন বসায়। "এখানে প্রস্রাব করিবেন, না করিলে পঞ্চাশ টাকা জরিমানা।
হা হা হা..."!
যাক
মিসির আলিকে একদিন জিজ্ঞেস করতে হবে চুন মারা, পিক ফালা আর রাস্তায়
প্রস্রাব করার ব্যপারে। কি আনন্দ পায় কিছু লোক এগুলো করে। আরো জিজ্ঞেস করতে
হবে, আমার লেখা সম্পর্কে। সত্যি কি মাঝেমধ্যে আমার লেখায় হুমায়ুন আহমেদ এর
আছর পড়ে.....?
...............
এসব
ভাবনায় ছেদ পড়লো ছোট মেয়েটার ডাকে। আব্বু তোমার ফোন, এই নাও। ও আমার
মোবাইল নিয়ে গেম খেলছিলো। সুযোগ পেলেই ও তাই করে। হাসপাতাল থেকে বাসায়
ফিরলে ওর প্রথম কাজ মোবাইল দখল করা। তার পর নেট ছেড়ে স্পাইডার ম্যান, টম
এন্ড জেরি ইত্যাদি দেখতে থাকা।
ওপাশ
থেকে হ্যালো শুনেই বুঝলাম মোফাজ্জল করিম চাচা। প্রায়শ শুক্রবার তিনি ফোন
করেন। শুক্রবার সকালে এ রকম সময়ে তিনি ফোন করলেই বুঝি "কালের কন্ঠ"
পত্রিকায় উনার কলাম এর ব্যপারে ফোন করেছেন।সমসাময়িক বিষয় নিয়ে সুন্দর কলাম
লেখেন। মাঝেমধ্যে টিভি তে টক শোতে যাবার আগেও ফোন দেন। বিষয় নিয়ে একটু আধটু
আলাপ করেন।
আমি
অবশ্য আলাপ করি মেপে মেপে। কারন আমি সরকারি কর্মকর্তা। আমাকে চলতে হয় মেপে
মেপে বলতে হয় মেপে। এগুলো আমি তাঁর কাছ থেকেই শিখেছি। উনি খুশি হন আমার
মাপা কথায়।
মোফাজ্জল
করিম সি এস পি ছিলেন। ঝানু সি এস পি। তিনি,এইচ টি ইমাম স্যার, সা'দত হোসেন
স্যার, এরা সবাই সি এস পি। সমসাময়িক, রিটায়ার্ড বাট কিংবদন্তি। রাজনৈতিক
প্ল্যাটফর্ম ভিন্ন কিন্তু বন্ধুত্বপুর্ন সম্পর্ক। প্রশাসনের সকল
কর্মকর্তারা এখনও তাদের গুরু মানেন। পরামর্শ নেন। আমি উনাদের লেখা ও টক শো
গুলো দেখি। দৈবাৎ আলাপ হয়। আমার আলাপ মাপা, আবেগময় না।
সরকারি
কর্মকর্তা দের কথা বলতে হয় মেপে মেপে, চলতে হয় মেপে মেপে। তাদের রাজনীতি
করতে মানা। বলা রাজনীতি করা একেবারে কবীরা গুনাহ। "হুজ পার্টি ইন গভমেন্ট
দেট নট আওয়ার কাপ অব টি। উই আর জাস্ট গভমেন্ট সারভেন্ট। গভমেন্ট ইন্টারেস্ট
ইজ আওয়ার ফ্রার্স্ট প্রায়োরিটি। এগুলো ফাউন্ডেশন ট্রেনিং এ শিখানো হয়।
একেবারে হাতে কলমে শিখানো বলা যায়। কিন্তু আমাদের কেউ কেউ এগুলো শিখেনা।
ফাউন্ডেশন
ট্রেনিং এর আফতাব স্যার ও সাদিক স্যার কে বাংলাদেশের সকল বি সি এস
ক্যাডাররা চিনেন। উনারা নিয়মিত ক্লাস করান। উনাদের ক্লাস মনে রাখার মতো।
আফতাব স্যার ক্লাস নেন বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে আর সাদিক স্যার অফিসার দের
ম্যানার এথিকেট নিয়ে। আরো অনেক সচিব রা ক্লাস নেন। আফতাব স্যার শুরু করেন
ইখতিয়ার উদ্দিন মো. বখতিয়ার খিলজী থেকে, শেষ করেন বর্তমান সরকারের আজকের
ক্লাস শুরু করার জাস্ট আগ পর্যন্ত সকল সাংবিধানিক ক্রিয়া কলাপ। চোখ বন্ধ
করে দাড়ি, কমা, সেমিকোলন সহ।
আর
সাদিক স্যারের ক্লাসের স্টাইল আলাদা। একটানা চার ঘন্টার ক্লাস। পিন পতন
নিরবতা। সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী রা কিভাবে চলবে, কিভাবে পরবে, কিভাবে
কথা বলবে, কিভাবে খাবে সব। খুঁটিনাটি সকল বিষয়। কার কোন বিরক্তি নেই। কখনো
সবাই হাসছে কখনো সবার চোখ দিয়ে টপ টপ করে জ্বল গড়িয়ে পড়ছে।
সাদিক স্যারের মুক্তিযুদ্ধে যাবার মুহুর্তের ঘটনা শুনে কেন কেউ কান্না চেপে রাখতে পারেনি সেদিন ক্লাসে। স্যার বলছেন...
".....আমি
যুদ্ধে যাবো। মার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি। মা তোমার কেমন লাগছে। মা কিছু
বলছেন না। চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জ্বল পড়ছে মায়ের। মাকে বললাম তুমি কি চাওনা
মা আমি যুদ্ধে যাই। মা বললেন তুই যুদ্ধে যাবি, দেশ স্বাধীন করতে যাবি,
অবশ্যই যাবি। আমিও তাই চাই। বাবা আমার তুই যদি যুদ্ধে শহীদ হস তাহলে আমি
বলতে পারবো আমি শহীদ জননী। তবে শেষ বারের মতো একটু খানি আমার বুকে আয়। দেখ
আমার কলজেটা কেমন করছে বাপ। আয় বাবা শেষ বারের মতো বুকে আয়...."।
আমি যুদ্ধে গেলাম। সেই বিদায় মুহুর্তটি যে কি কষ্টের ছিলো তা একমাত্র আমি আর আমার মা ই বুঝি।
একসময়
ফাউন্ডেশন ট্রেনিং এ মোফাজ্জল করিম মহোদয় ও ক্লাস নিতেন। যাহোক তিনি কালের
কন্ঠে আজকে গুলশানের রেইন ট্রি র ঘটনা নিয়ে লিখেছেন। ওটা বলতেই ফোন
করেছেন। রাখার আগে বললেন "এই শুনলাম তুমি নাকি কি একটা লেখছো, গল্প না
উপন্যাস। সত্যি নাকি...
আমি আমতা আমতা করে বললাম,জ্বি...
কই, আমাকে কিছু বললেনা, দেখালেও না....
জ্বি চাচা আমি ভেবেছিলাম শেষ পর্ব লিখে একসাথে দেখাবো...
ওকে যতটুকু হয়েছে আমাকে মেইল করো...
জ্বি,আমি
এখনি করছি বলে ফোনটা রাখলাম। বিছানায় বসেই মোবাইলে সব কটা পর্ব মেইল
করলাম। তারপর মোবাইলেই উনার লেখাটা পড়লাম। সুন্দর লেখা। আরেকটি সংবাদ বেশ
নজর কাড়লো। ঢাকার একটি ক্লিনিকে রুগীর লোকরা ডাক্তার কে মারধোর করেছে।
ক্লিনিক ভেংগেছে। ডাক্তার নাকি ডেংগু জ্বর কে ভুল করে ক্যানসার ভেবে
চিকিৎসা দিয়েছে। তাই রুগী মরে গেছে। আর এ ভুল করেছেন এই সাবকন্টিনেন্টের
একজন বিখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ!! এ নিয়ে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টর
নাকি মামলাও ঠুকে দিয়েছেন সেই বিখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞের বিরুদ্ধে!!!
মানুষের
হিউম্যান সাইকোলজিক্যাল ডিফেন্সিভ মেজানিজম বলে একটি কথা আছে। মানুষ তার
অন্তরের বেদনা কে শান্তনা দিতে বা নিজের ভুল ত্রুটি ঢাকতে অনেক সময় অন্যের
উপর নিজের অজান্তেই দোষটা চাপে। অনেক ধরনের ডিফেন্সিভ মেকানিজম আছে যেমন
ডিসপ্লেসমেন্ট, রেসোনালাইজেশন, রিপ্রেশন, রিগ্রেশন, ডেনিয়েল ইত্যাদি
ইত্যাদি।
ধরুন
একজন স্বামী তার স্ত্রী কে ঘরে রেখে একা একা বাইরে বেড়ান। কিন্তু তিনি
নিজের মনকে বুঝান তার স্ত্রী বাইরে বেরুতে লজ্জা পান বা পছন্দ করেন না।
অথবা ধরুন পরীক্ষার ভাইবায় ফেল করলো একজন শিক্ষার্থী। সে তখন এই বলে নিজেকে
সান্তনা দেন যে, নিশ্চয় স্যার তাকে পছন্দ করেননা। এই জন্যে তাকে ফেল
করিয়েছেন। সাইকোলজিক্যাল ডিফেন্সিভ মেকানিজমের ভাষায় একে বলা হয়
রেসোনালাইজেশন।
আরেকটি
উদাহরন দেই, যেমন ধরুন একজনের স্ত্রী মারা গেলেন হাসপাতালে। তিনি সাথে
সাথে দোষ চাপান ডাক্তারের উপর। এটা করে তিনি একদিকে মনের হতাশা কে শান্তনা
দেন আরেক দিকে নিজের স্ত্রী র চিকিৎসা করতে যে অবহেলা বা গাফলতি করছিলেন
সেটা ঢাকেন। অনেকটা উদোর পিন্ডি ভুঁদোড় ঘাড়ে চাপানোর মতো অবস্থা । একে
সাইকোলজিক্যাল ডিফেন্সিভ মেমেকানিজমের ভাষায় বলে ডিসপ্লেসমেন্ট।
এ
গুলোতো ঠিক এভাবেই উদাহরণ দিয়ে বইয়ে লেখা আছে। (রেফারেন্সঃ অক্সফোর্ড
টেক্সট বুক অব সাইকিয়াট্রি, পেইজ নাম্বার ১৫৫)। শত শত বছর আগে এরিস্টটল
প্লেটো বা ধরুন এযুগের বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্ট এর মধ্যে সিগমন্ড ফ্রয়েড এর
মতো সাইকিয়াট্রিস্ট ও সাইকোলজিস্টরাও তাদের বইয়ে লিখে গেছেন। ছাত্ররা না হয়
ভাবলাম ইমোশনাল হয়ে ভুল করেছে। কিন্তু একজন প্রোক্টর হয়ে তাঁর অবশ্যই
এগুলো জানার কথা ছিলো, অথচ তিনিই কি না ডাক্তারের বিরুদ্ধে মামলা করলেন।
এখন আবার সমঝোতা করছেন।
যাহোক এগুলো আর বলে কি হবে। কে কার কথায় গুরুত্ব দিবে। কবে যে আমরা সভ্য হবো।
এ
নিয়ে না ভেবে ভাবলাম বংশের বাত্তি টার শেষ পর্ব লিখি। বংশের বাত্তি র শেষ
পর্ব টার শেষ টা বেশ জটিল আর বিয়োগান্তক। সেদিন শেষ করেছিলাম পিংকি সকালে
ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছে। সেই জায়গাতে।
সেদিন
পিংকি হঠাৎ করে বারান্দায় অজ্ঞান হয়ে পড়ার পর তার দুলাভাই মতলুব সাহেব তড়ি
ঘড়ি করে ক্লিনিকে নিয়ে আসেন। পরে তিনি আমার হাসপাতালে ও যান। কথা বলার
চেষ্টা করেন। আমি তাকে বলছিলাম ফিরতি পথে দেখতে যাবো।
ক্লিনিকে
গিয়ে দেখি পিংকি বেডে আধা শুয়া অবস্থায়। পিঠের নিচে দুটো বালিশ দিয়ে শুয়ে
আছে। স্যালাইন চলছে। রোগিরা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যখন কিছুটা সুস্থ হয় তখন
তারা এভাবে হেলান দিয়ে শুয়ে থাকে। শুয়ে শুয়ে ডাক্তারের অপেক্ষা করে আর
স্যুপ ট্যুপ জাতিয় কিছু খায়। ডাক্তার এসে শেষ একটা পরামর্শ দিয়ে তাদের
ডিসচার্জ দিবেন।
পিংকি
ও স্যুপ খাচ্ছিলো। ওর মা ওকে চামচ দিয়ে মুখে তুলে খাওয়াচ্ছিলেন। এটা
স্বাভাবিক। অসুস্থ হলে শাশুড়িকে বউ'দের মুখে তুলে খাওয়াতে খুব একটা দেখা
যায়না। তবে মা দের এটা করতে দেখা যায়। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আরেকটা জিনিষ
কিছু কিছু মাকে বিয়ের পর করতে দেখা যায় তা হলো দাম্পত্য জীবনের সকল
খুঁটিনাটি ব্যাপারে মেয়ে কে পরামর্শ দেয়া বা দেবার চেষ্টা করা।
মেয়ের
দাম্পত্য বিষয়ে পরামর্শ বা নাক গলানো মা'দের একেবারেই উচিৎ না।। স্বামী
স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনে "এডজাস্টমেন্ট ডিসওর্ডার" এর একটি কারন মা মেয়ের এই
গোপন কথোপকথন বা শলাপরামর্শ। অনেক ক্ষেত্রে এটা সংসার ভাংগার কারন হয়ে
দাঁড়ায়।
যাক
এখনকার মুখে স্যুপ তুলে খাওয়ানোর ব্যাপারটা ওরকম কিছু না। পিংকি আজ একটু
অসুস্থ। তাই তার মা ছুটে এসেছেন। স্যুপ খাওয়াচ্ছেন। আমাকে দেখে স্যুপের
বাটি রেখে তারা তড়ি ঘড়ি করে ঠিকঠাক হয়ে নিলেন।
আত্মীয়
স্বজন সবাই এসেছেন। ওকে ঘিরে আছেন চার পাশ থেকে। মতলুব সাহেব কিছুটা
নার্ভাস। তিনি বার বার ঘাম মুছছেন কপালের । আমি বললাম আপনারা সবাই একটু
বাইরে গিয়ে বসুন। সবাই এক এক করে বের হয়ে গেলেন। মতলুব সাহেব তার স্ত্রী ও
পিংকির মা দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি তাদের কে ও ইশারা করলাম । মতলুব সাহেব বললেন
আমরা ও...
হ্যা...
সিস্টার সবাইকে বের করে সে পিংকির মাথার কাছে দাঁড়িয়ে থাকলো বি পি আর স্ট্যাথো নিয়ে।
কেমন আছো পিংকি....
স্যার ভালো...
কি ব্যাপার, তুমি নাকি অজ্ঞান হয়েছিলে..
ও হেসে দিলো
হি হি..,না স্যার একটু ভয় দিলাম...
ভয়, কাকে...
মতলুব দুলাভাই কে...
তা বুঝলাম, কিন্তু কেন...
এমনি এমনি...
না এমনি এমনি না। ওকে..
তোমার হাসবেন্ড কেমন আছেন
স্যার ভালো না....
ওর
হাসিমাখা মুখ মুহুর্তেই মলিন হয়ে গেলো। স্যার আমি কি করবো, কিইবা করা উচিৎ
কিছুই ভেবে পাইনা। সব কিছু শুন্য দেখি। মাঝেমধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা আসে।
জানেন কাল আমি একবার ভাবছিলাম উনাকে সত্যি কথাটা বলি। বলা উচিৎ।
বংশেরবাত্তি বিষয়টা ঠিক নয়। কিন্তু উনার মন ভেংগে যাবে তাই বলিনি। এভাবে আর
কত দিন। সত্যকে এড়ানো ঠিকনা। আমি কি বলে দিবো এখন?
হ্যা ঠিক বলেছো। সত্য কে আড়াল করা ঠিক না। তা যতই তিক্ত হোক।
আমি
জানি এটার জানার পর প্রথমে উনাদের সবার মন খারাপ হবে। তার পর আমার ননদ আর
মতলুব ভাই মিলে একজন উকিল ডাকবে। আমার স্বামী যে উইল করেছেন আমাকে তা বাতিল
করতে বলবে। তিনি হয়তো রাজী হবেন না, কিন্তু তারা এটা তাকে বুঝিয়ে করাবে।
মতলুব ভাই যে আমার প্রতি উল্টো পালটা আচরণ করছেন এগুলো সবই প্ল্যান। আমার
চরিত্রে কালিমা লেপনের চেষ্টা মাত্র।
তুমিতো বেশ ভালোই দেখি চিন্তা ভাবনা করতে শিখেছো। ইটস এ গুড সাইন।
আরেকটা ব্যাপার কি জানেন...
আল্লাহ
না করুক যদি তিনি এই মুহুর্তে মারা যান তাহলে তারা আমাকে তাদের বড় যে ভাই
আছেন দৈহিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী উনার সাথে আমার বিয়ে দিবে। জোর করে দিবে।
আচ্ছা তুমি এখন কি ভাবছো বা এখন তোমার কি করা উচিৎ মনে করো...
বলবো...
সত্যি বলবো...
অফকোর্স...
স্যার
আমি এখন কিছুই করবো না। ইনফ্যাক্ট আমার এখন কিছুই করার নেই।শুধুই লোকটার
সেবা করবো পাশে থাকবো। তারপর আবার কলেজে ভর্তি হবো। পড়াশুনা করবো। একটা
স্কুল দিবো। বাচ্চাদের স্কুল। আমার মাকে ও তাই বলেছি। মা ও একি কথা বলেছেন।
তিনি বলেছেন তার সকল গহনা বিক্রি করে আমার স্কুলে দিবেন।
জানেন
স্যার কাল রাতে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলাম। দেখি কি আমি ধবধবে সাদা একটা
শাড়ী পড়ে বসে আছি আর আমাকে ঘিরে গোল হয়ে করেকটি শিশু "ওপেনটি
বায়স্কোপ"খেলছে...
"...ওপেন টি বায়োস্কোপ
নাইন টেন টেস্কোপ
সুলতানা বিবিয়ানা
সাহেব বাবুর বৈঠকখানা
রাজবাড়িতে গেছে
পান সুপারি খেতে
পানের আগায় মরিচ বাটা
স্প্রিঙে চাবি আঁটা
যার নাম রেণুবালা
তাকে দেবো
মুক্তার মালা... "
স্যার আপনি আমার স্কুলের জন্য একটা নাম দিবেন। দেবেন তো.....!
তার গলা ধরে আসছে। ধরা গলায় বললো..
স্যার ক্যানসারের রুগীরা কি রোজা রাখতে পারে। সামনে তো রোজার মাস। রাহমাত, মাগফেরাত আর নাজাতের মাস। তিনি বলেছিলেন...
"পিংকি
এটা মনে হয় আমার জীবনের শেষ রোজার মাস। আমি রোজা রাখতে চাই। রোজার মাস
পবিত্র মাস। এমাসে পাপ মোচন হয়, দোয়া কবুল হয়। তুমি আমার জন্যে দোয়া
করো..."
আমি দেখলাম মেয়েটির দুচোখ বেয়ে অস্রু গড়িয়ে পড়ছে অবিরত.....
লেখক: ডা. সাঈদ এনাম । এম.বি.বি.এস (ডি এম সি) এম ফিল (সাইকিয়াট্রি) সাইকিয়াট্রিস্ট ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা।
৫ম পর্ব পড়তে লিঙ্কে ক্লিক করুনঃ ৫ম পর্ব লিঙ্ক
২য় পর্ব পড়তে লিঙ্কে ক্লিক করুনঃ ২য় পর্ব লিঙ্ক১ম পর্ব পড়তে লিঙ্কে ক্লিক করুনঃ ১ম পর্ব লিঙ্ক
