'এটিএম তুরাব স্মৃতি পদক' পেলেন সিনিয়র সাংবাদিক আবদুল কাদের তাপাদার


এমদাদুর রহমান চৌধুরী জিয়া, সিলেট ব্যুরো: পেশাগত দায়িত্ব পালন কালে  পুলিশের গুলিতে  জীবন দিয়ে   দেশের ক্রান্তিলগ্নে জীবনের চেয়ে একজন সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব  যে কত বেশি   তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনকরে গেছেন সিলেটে ইতিহাস সৃষ্টিকারী  পুলিশের গুলিতে নিহত  সাংবাদিক এটিএম  তুরাব নিজেই। 

তরুণ সাংবাদিক, দৈনিক নয়া দিগন্ত ও দৈনিক জালালাবাদের তৎকালীন রিপোর্টার এটিএম তুরাবের স্মৃতি রক্ষার্থে সিলেট প্রেসক্লাব প্রবর্তিত সাংবাদিক এটিএম তুরাব স্মৃতি পদকে ভূষিত হয়েছেন সিলেটের  সিনিয়র সাংবাদিক ও দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট ব্যুরো  প্রধান আবদুল কাদের তাপাদার। যিনি এক সময় দৈনিক জালালাবাদ এর  নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।   যার কারণে  বিভাগ জুড়ে  তৃণমূলে থাকা সাংবাদিকদের সাথেও  রয়েছে তার গভীর সম্পর্ক  ও ভালোবাসা।

দৈনিক নয়া দিগন্তে  তথ্য ভিত্তিক সংবাদ উপস্থাপন করে অনিয়ম দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে ইতিপূর্বে   আব্দুল কাদের তফাদার এর বেশ কিছু সংবাদ পাঠক মহলে সমাধীত। তিনি শুধুই একজন সিনিয়র সাংবাদিক নয় একজন ক্লিন ইমেজের মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে রয়েছে  তার ব্যাপক পরিচিতি। পদকপ্রাপ্ত সিনিয়র সাংবাদিক আবদুল কাদের তাপাদার সিলেটে সাড়ে ৩ দশক ধরে বিভিন্ন সাড়া জাগানো রিপোর্টের কারণে আলোচিত। অনুসন্ধানী রিপোর্টের কারণে তিনি বহু বার মামলার আসামি হয়েছেন তিনি।

 পদক ও সম্মাণনার অর্থ পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিকের হাতে তুলে দেন  বর্তমান সরকারের  প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। 

সিলেট প্রেসক্লাব সভাপতি মুকতাবিস উন নূরের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিলেট -৬ আসনের সংসদ সদস্য আ্যডভোকেট এমরান আহমেদ চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসাইন চৌধুরী ও সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক( সার্বিক) সাঈদা পারভীন।

পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত সাংবাদিক এটিএম তুরাবের দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকীতে এ আলোচনা সভারও আয়োজন করা হয়। 

 অনুভূতি ব্যক্ত করে বক্তব্য করেন  এটিএম তুরাব পদকপ্রাপ্ত  দৈনিক নয়া দিগন্তের ব্যুরো প্রধান আবদুল কাদের তাপাদার। তিনি বলেন, সিলেটের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তুরাব হত্যার ঘটনা  ন্যাক্কারজনক। 

এসময় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন,  জুলাই আন্দোলনে শহীদ এটিএম তুরাব আমাদের সকলের প্রেরণার উৎস। এ হত্যার সাথে জড়িত সকলকে বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালার বিষয়ে আলোকপাত করে তিনি বলেন, সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে তুরাব শহীদ হয়েছেন। গত ১৫ বছর অপতথ্যের মাধ্যমে দেশকে তথ্য সন্ত্রাসে পরিণত করা হয়েছিল। বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দাফন হয়ে গেছে। বিগত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে মিডিয়া স্বাধীনভাবে তার কার্যক্রম  চালাচ্ছে।

 অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের কলম ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভেদাভেদ থাকতে পারে। কিন্তু দেশের ব্যাপারে আমাদের সকলকে এক থাকতে হবে। দেশপ্রেমের চেতনা নিয়ে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান তিনি।

এমপি এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, তুরাবের লাশ ছিনিয়ে নেয়ার অপচেষ্টার স্বাক্ষী আমরা। মামলায় আমাদের লোকজনকেও আসামি করা হয়। এটা হচ্ছে নির্মম বাস্তবতা। জুলাই বিপ্লবে তুরাব ও গোলাপগঞ্জের ৭ জন নিরীহ মানুষকে হত্যার অগ্রগতি নিয়ে তিনি সম্প্রতি চিফ প্রসিকিউটরের সাথে আলোচনা করেছেন। এ হত্যাকান্ডের বিলম্বে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা প্রতিশোধপরায়ণ হতে চাই না। এ হত্যার বিচারের মধ্য দিয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে-এটাই প্রত্যাশা । 

সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান লোদী (কয়েস লোদী) তুরাব হত্যার বিচার কার্যক্রম তুরাব হত্যাকান্ডের তদন্ত প্রক্রিয়া সাগর রুনি হত্যাকান্ডের মতো হয়ে যায় কিনা-এই আশংকা ব্যক্ত করেন। 

মহানগর জামায়াতের আমীর ফখরুল ইসলাম এ মামলার তেমন অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। 

মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী বলেছেন এ সরকার কোন অন্যায়কে ছাড় দেবে না। 

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাঈদা পারভীন বলেন, রাজনীতির কারণে কারো রক্ত ঝরুক-এটা আমরা চাই না। 

বক্তব্য রাখেন-ক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী ও ইকরামুল কবির, সিনিয়র সহ-সভাপতি এম এ হান্নান, সিলেট মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা বদর, সাবেক কোষাধ্যক্ষ কবীর আহমদ সোহেল, ক্লাবের সহ-সাধারণ সম্পাদক খালেদ আহমদ, ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন। শুরুতে পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেন ক্লাব সদস্য কবির আহমদ।  

পরে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক আবদুল কাদের তাপাদারের হাতে ক্রেস্ট ও সম্মাননা তুলে দেন প্রধান অতিথিসহ অন্য অতিথিবৃন্দ। 

ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন-ক্রীড়া ও সংস্কৃতি সম্পাদক শেখ আশরাফুল আলম নাসির, পাঠাগার ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. মুহিবুর রহমান, কার্যনির্বাহী সদস্য আমজাদ হোসাইন ও আনাস হাবিব কলিন্স।

সভাপতির বক্তব্যে সিলেট প্রেসক্লাব সভাপতি  মুকতাবিস উন নূর বলেন, একটি পক্ষ এই হত্যা মামলার আসামীদের রক্ষার জন্য শুরুতেই তৎপর ছিল। তুরাবের পরিবার যেন ইনসাফ পায়-তিনি সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। 

ডেটলাইন ১৯ জুলাই ২০২৪ : যেভাবে গুলি করে হত্যা করা হয় সাংবাদিক তুরাবকে

১৯ জুলাই শুক্রবার জুমুয়ার নামাজ শেষ হতেই সিলেটে মিছিল বের করে বিএনপি ও সমমনা কয়েকটি দল। মিছিলে কোনো উত্তেজনা নেই। পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক। নিত্যদিনের মতো সাংবাদিকরা সেখানে উপস্থিত হন। নগরের প্রাণকেন্দ্র বন্দরবাজার এলাকায় অতিক্রম করছিল বিশাল মিছিল, পাশেই পুলিশের সশস্ত্র অবস্থান। হঠাৎই অতি উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা এসএমপির তৎকালীন এডিসি সাদেক কাউসার দস্তগীর ও ডিসি আজহাবার আলী শেখ এর মারমুখী আচরণে বদলে যায় পরিস্থিতি। উতপ্ত হয়ে উঠে সিলেটের বন্দরবাজার কোর্ট পয়েন্ট এলাকা। তখন পুলিশের কিলিং মিশনের টার্গেটে পড়ে যান সাংবাদিক এ টি এম তুরাব। 

 তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেলে   নিয়ে গেলে  মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা: শামসুল ইসলাম জানান, তুরাবের শরীরে ৯৮টি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। গুলিতে তার লিভার ও ফুসফুস মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়। মাথায়ও মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন ছিল। তুরাব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সেদিনে সিলেটসহ পুরো বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে উঠে। অনেক জায়গায় পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়, আহত হয় অনেকেই।

Post a Comment

Previous Post Next Post