ডা. সেলিনা ডেইজি: শিশু যখন ভূমিষ্ঠ হয় তখন বাবা-মা আত্মীয়স্বজন আশা করেন, শিশুটি ঠিক সময়ে সবকিছু করবে। কিন্তু যখন দেখেন শিশুটি কথা বলছে না, তখন তারা অস্থির হয়ে পড়েন। শিশুটি অচিরেই কথা বলবে, এই আশ্বাস নিয়ে আরও কিছুদিন কেটে যায়। কিন্তু এরপরও যখন সে কথা বলে না, তখন ডাক্তারের কাছে যান, তখন বেশ দেরি হয়ে যায়। আগে এলে যতটা উন্নতি সম্ভব হতো, দেরি করায় উন্নতিতে কিছুটা বাধার সৃষ্টি হয়। শিশু কোন বয়সে কী কথা বলে-আপনার শিশুটির সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখুন।
জন্ম থেকে দেড় মাস বয়সে কোনো শব্দ হলে সে সেটা খেয়াল করে। দেড় থেকে তিন মাস বয়সে হাসে ও গলা থেকে আওয়াজ করে। সাড়ে তিন থেকে সাড়ে সাত মাস বয়সে কোনো কথাবার্তা বা আওয়াজ হলে সে সেদিকে ঘাড় ঘোরায় বা তাকায়। সাড়ে পাঁচ থেকে নয় মাস বয়সে মা মা, দা দা একা একাই বলে। নয় থেকে ১২ মাস বয়সে মা মা, দা দা বলে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে অর্থাৎ ক্ষুধা পেলে বা কোলে ওঠার জন্য বা দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য। ১২ থেকে ১৮ মাস বয়সে মা মা, দা দা ছাড়াও আরও তিন-চারটা দুই অক্ষরের শব্দ বলে। ১৪ থেকে ২২ মাস বয়সে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চেনে এবং দেখাতে পারে। ১৫ থেকে ২২ মাস বয়সে দু-তিনটা নির্দেশ দিলে সেটা বোঝে এবং করতে পারে। ১৬ থেকে ২৪ মাস বয়সে ছবি দেখে বা বাস্তবে সেটা তার নাম বলতে পারে। ২৪ থেকে ৩০ মাস বয়সে তার পুরো নাম বলতে পারে। ৩০ থেকে ৩৬ মাস বয়সে দু-তিনটা বাক্য একত্র করে বলে পুরো ঘটনা বলতে পারে। চার বছর বয়সে সব কথা স্পষ্ট এবং বড় মানুষের মতো সব ঘটনা বলতে পারে।
আর যেসব শিশু এগুলো দেরিতে করে তাদের ডায়াগনোসিস করা উচিত, কেন তারা কথা বলছে না। এর কয়েকটি প্রধান কারণ হচ্ছে :
* সর্বপ্রথম দেখতে হবে শিশুটি কানে ঠিকমতো শোনে কি না। কানে কম শোনার জন্যও কথা অস্পষ্ট বা ঠিক সময়ে বলে না।
* অটিজম কি না-সাধারণত এসব শিশু দুই আড়াই বছর পর্যন্ত দু-একটা কথা বলে, তারপর ধীরে ধীরে সে কথা বলা কমিয়ে দেয়। এসব শিশুকে যত আগে চিহ্নিত করা যায় এবং চিকিৎসা করা হয় ততই তাদের জন্য ভালো, দেরি হলে উন্নতির সম্ভাবনা কমে যায়।
* মস্তিষ্কে কোনো অদৃশ্য খিঁচুনি হলে; বাহ্যিকভাবে কোনো খিঁচুনি থাকে না। বিশেষ পরীক্ষা, যেমন ইইজি করলে সহজেই ধরা পড়ে।
* মস্তিষ্কের বিশেষ অংশে অবস্থিত শোনার বা কথা বলার জায়গায় কোনো আঘাত বা অসুবিধা থাকলে, সেটা এমআরআই করলে ধরা পড়তে পারে।
* মস্তিষ্কে কোনো ডিজেনাইরেটিভ ডিজিজ হলে বিশেষ রক্ত পরীক্ষা বা এমআরআই করলে ধরা পড়তে পারে।
* সোশিও কমিউনিকেটিভ ডিপ্রাইভেশন অর্থাৎ সামাজিকভাবে একা একা থাকা। বাবা-মা দুজনই বাইরে বাইরে থাকে, অর্থাৎ চাকরি করে। কেউ যদি শিশুটির সঙ্গে সময় না কাটায়, কাজের লোক তাকে টিভির সামনে বসিয়ে রেখে চলে যায়, তবে এসব শিশুরও কথা বলতে দেরি হয়।
* শিশু যদি অল্পমাত্রায় মানসিক প্রতিবন্ধী হয়, তাহলেও সে কথা বলতে দেরি করে।
* ডেভেলপমেন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজ ডিলে সমস্যা হলে কোনো কারণ ছাড়াই কথা বলতে দেরি করে। এসব শিশু একটু প্রশিক্ষণ দিলেই কথা বলতে শুরু করে।
সুতরাং শিশু যদি কথা না বলে বা বলতে দেরি করে, তাহলে মিথ্যে আশ্বাস নিয়ে বসে না থেকে ডায়াগনোসিস করুন এবং ব্যবস্থা নিন।
পরামর্শ
* শিশুকে বেশি সময় টিভির সামনে বসিয়ে রাখবেন না। তার সঙ্গে বেশি বেশি কথা বলুন।
* শরীরে কাতুকুতু দিন বা বিভিন্ন রকমের মুখভঙ্গি করে ওকে হাসানোর চেষ্টা করুন। ওর গলায় আওয়াজ বের করুন।
* কুকুরের ঘেউ ঘেউ, বিড়ালের মিও মিও, গরুর হাম্বা-এগুলো করুন এবং শিশুকে করতে সাহায্য করুন।
* অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশতে দিন।
* ওকে ওর জগৎ থেকে বের করে আনুন। কোনো সময় তাকে একা রাখবেন না, সব সময় ওর সঙ্গে একটা কিছু করুন।
* শিশু একটু কথা বললে বা আওয়াজ দিলেই ওকে জড়িয়ে ধরে আদর করুন, চুমু খান বা কোনো পুরস্কার দিন।
এভাবে তার মুখের বোল ফোটাতে সাহায্য করতে পারেন।
লেখক : শিশু স্নায়ু রোগ বিশেষজ্ঞ
