'কুলাউড়ার মানুষ কুতুব ভাইকে স্মরন রাখবে চলন্তিকার জনক হিসেবে'

  



আহসানুজ্জামান রাসেল: কুলাউড়ার এনসি স্কুল খেলার মাঠ নিয়ে আমাদের অনেকেরই অভিযোগের শেষ নাই। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের অনেকেই এ মাঠে নামতেই রাজী নয়। অথচ অনেক ইতিহাসের সাক্ষী এই ঐতিহ্যবাহী মাঠ। একসময় এই মাঠের পশ্চিম দিকে বিশাল তিনটা গর্ত ছিলো এবং উত্তর দক্ষিণ বরাবর লম্বা লম্বি খাল ছিলো। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় তৎকালীন টিএনও সিরাজুল ইসলামের সময় মাঠের এই গর্তগুলো ভরাট করার দায়িত্ব পান আব্দুল ফাত্তাহ ফজলু স্যার। তখন লোয়াইউনী থেকে লাল মাটি এনে এই গর্তগুলো ভরাট করে মাঠকে খেলার উপযুক্ত করা হয়। আমাদের নতুন প্রজন্ম এই ইতিহাস সম্পর্কে হয়তো একদমই অবগত নয়। পুরাতন এই ইতিহাস সম্পর্কে আমাদেরকে যিনি অবগত করেন তিনি হলেন রাউৎগাঁও ইউনিয়নের নর্তন গ্রামের বাসিন্দা কুলাউড়ার সোনালী প্রজন্মের কৃতি ফুটবলার সৈয়দ কুতুব উদ্দিন আহমেদ। 

 

তিনি ক্ষেতের মাঠ থেকে উঠে এসে হয়ে গেলেন কুলাউড়া ফুটবলের কুতুব। অনেকটা এই রকম আসলেন, খেললেন এবং জয় করলেন দর্শকের মন। কুতুব ভাইয়ের জন্ম ১৯৬৫ সালে রাউৎগাঁও ইউনিয়নের নর্তন গ্রামে। হাইস্কুলে পড়াকালীন সময়ে স্কুল আঙ্গিনায় ফুটবলের অনুশীলন, বিকেলে ক্ষেতের মাঠে প্রতিদিন সঙ্গী সাথীদের নিয়ে ফুটবল খেলা এভাবেই শুরু। পরবর্তী সময়ে ইউনিয়ন বা ইউনিয়নের বাহিরে বিভিন্ন ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ, প্রতিভার ঝলক, শুরু হলো আলোচনা, ছড়িয়ে পড়লো সুনাম। বাড়ী নর্তন হলেও চলে এলেন কুলাউড়ার মাগুরায় উনার বোনের বাসায়। সেখান থেকে শুরু কুলাউড়ার বিভিন্ন মাঠে উনার ফুটবল শৈলি। কুলাউড়ার ফুটবল ইতিহাসে কুতুব ভাইকে একটা নতুন ধারার প্রবর্তক বলা হয়ে থাকে। আশির দশকের প্রথম দিকে সমস্বর যুব সংঘের একক অাধিপত্যের কারনে কুলাউড়ার ফুটবলে অনেকটা একঘেয়েমি চলে এসেছিলো। কারণ জাতীয় তরুন সংঘ তখন ফুটবলে কিছুটা নিস্প্রভ ছিলো। ঠিক সেই সময় এক ঝাঁক তরুণ প্রতিভাবান ফুটবলারদের নিয়ে কুতুব ভাই গঠন করেছিলেন চলন্তিকা ফুটবল ক্লাব। এতে উনার সহযাত্রী ছিলেন লিটন, কাবুল, বাছিত, বজলু, বাদল, আব্দুস সালাম, ফরহাদ, তমাল, তারেক, তারহাম সহ আরো অনেকে। সত্যিকারের নেতার মতো তখনকার নতুন প্রজন্মকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন। আসলে নেতৃত্ব দেবার ধরণ একেক জনের একেক রকম। কেউ অতি আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বল প্রয়োগ করে বকাঝকা দিয়ে দলকে নেতৃত্ব দেয় আবার কেউ ঠান্ডা মাথায় খেলোয়াড় বোঝে দল পরিচালনা করে। কুতুব ভাই ছিলেন খুব ঠান্ডা মাথার রসিক এবং মজার মানুষ যিনি শুধু মাঠের ভিতরে নয় মাঠের বাহিরেও ঐ প্রজন্মের নেতা ছিলেন। নিজে খেলতেন মধ্য মাঠে এবং উনার প্রধান কাজ ছিলো বল যোগান দেয়া। স্মরনীয় ফুটবল ম্যাচ ছিলো নব্বই দশকের প্রথম দিকে এন সি স্কুল মাঠে চলন্তিকা বনাম বণিক সমিতির ফাইনাল ম্যাচটি। প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে হাজার হাজার দর্শকদের সামনে চলন্তুিকার ফুটবলাররা মনপ্রাণ উজার করে উনাদের সেরা খেলাটাই খেলেছিলো। প্রতিপক্ষ বণিক সমতির হয়ে খেলেছিলেন খলিল, মিকি, মান্না ফয়সাল সহ সিলেট ওয়াপদার বাচাই করা কয়েকজন প্লেয়ার। আর চলন্তিকার হয়ে কুতুব ভাইর নেতৃত্বে কাবুল, লিটন, তরহাম সহ লোকাল খেলোয়াড়রা। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইর পর টাইব্রেকারে বণিক সমিতির কাছে চলন্তিকা পরাজিত হয়েছিলো। এছাড়াও কুতুব ভাই আশির দশকে কুলাউড়া একাদশের নিয়মিত খেলোয়াড় ছিলেন। খেলেছেন তৎকালীন সিলেট জেলার একক ও অদ্বিতীয় মোস্তফা আল্লামা গোল্ডকাপ টূর্ণামেন্টে কদমতলী ফুটবল একাদশের পক্ষে।

 

আরেকটা ম্যাচের সৃত্মিচারণ করেন যে ম্যাচে উনি অবশ্য দর্শক ছিলেন। আশির দশকের প্রথম দিকে কুলাউড়া এবং কাদিপুর ইউনিয়নের ফাইনাল ম্যাচ অনেকটা অালোচিত ফাইনাল ছিলো। উক্ত ম্যাচে একসময় গন্ডগোল শুরু হলে কুতুব ভাই মাঠের মধ্যে চলে যান এবং সেখান থেকে দেখেন জয়পাশার এক দর্শক কাদিপুরের একজনকে ছাতা দিয়ে আঘাত করছে। 


ব্যক্তিগত জীবনে কুতুব ভাই এক ছেলে আর তিন মেয়ের গর্বিত বাবা। ৫ ভাইর মধ্যে উনি ছিলেন সবার ছোট। উনার বড় ভাই সৈয়দ মইজ উদ্দিন আহমেদ (আকল) ও নবীন চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক মরহুম সৈয়দ কামাল উদ্দিন আহমেদ। একসময় রাউৎগাঁও ইউনিয়নের মেম্বার ছিলেন কুতুব ভাই এবং বর্তমানে আমতলা বাজারে (আমঝোঁপ) নিজের একটা ফার্মেসি পরিচালনা করছেন। 
নতুন প্রজন্মের কাছে উনার প্রত্যাশা কুলাউড়ার ফুটবলের হারানো গৌরব যেনো ওরা ফিরিয়ে নিয়ে আসে এবং এক্ষেত্রে উনার কোন সহযোগিতার প্রয়োজন হলে যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন।




Post a Comment

Previous Post Next Post