অনলাইন ডেস্কঃ বিমানের হিমঘরে শুয়ে আনিসুল হক আজ ফিরছেন তাঁর স্বপ্নের ঢাকায়, চিরতরে শায়িত হবেন বনানী কবরস্থানে; মা ফাতেমা জোহরা বেগমের কোলঘেঁষে। এর আগে শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় স্বপ্নরাজকে বিদায় জানাবে স্বপ্নভঙ্গে কাতর ঢাকাবাসী।
রবিবার পর্যন্ত তিন দিনের শোকও পালন করবে কিংবদন্তি মেয়রকে হারানো নগরবাসী।
‘আমরা ঢাকা’য় স্লোগান নিয়ে আধুনিক ঢাকা গড়ার রূপকার আনিসুল হকের প্রথম জানাজা গতকাল শুক্রবার বাদ জুমা লন্ডনের লিজেন্ড পার্ক মসজিদে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ সময় গতকাল রাত ১২টা ১৫ মিনিটে তাঁকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট নম্বর বিজি-০০২ লন্ডন থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। সকাল সাড়ে ১১টায় ঢাকায় অবতরণ করবে আনিসুল হকের লাশবাহী বিমানটি। সেখান থেকে লাশ যাবে তাঁর বনানীর ২৩ নম্বরের বাড়িতে।
আনিসুল হকের লাশের ভার বহনের আগেই শোকে স্তব্ধ তাঁর শৈল্পিক বাড়ি। তবে সীমানাপ্রাচীর গলে বেরিয়ে আসা পানি সরবরাহের ট্যাপটি চালু ছিল গতকালও। মেয়রের মৃত্যুর শোকে কাতর দরিদ্র এক নারী ও কয়েকটি কিশোর-কিশোরী বোতল ভরে পানি নিচ্ছিল সেই ট্যাপ থেকে।
আজ আনিসুল হক নিজের বাড়ি থেকে চিরতরে বের হবেন আসার অল্প কিছুক্ষণ পরই।
বিকেল ৩টায় মরদেহ রাখা হবে আর্মি স্টেডিয়ামে। তাঁকে ফুলেল শ্রদ্ধায় শেষবিদায় জানাবে নগরবাসী। বিকেল ৪টায় আসরের নামাজের পরপরই জানাজা অনুষ্ঠিত হবে, পরে বনানী কবরস্থানে মায়ের পাশে চিরশায়িত হবেন তিনি।
নাগরিক দুর্ভোগে উত্পীড়িত নগরবাসীকে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিলেন আনিসুল হক। স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাঝপথে নিজেই পাড়ি জমালেন অনন্তলোকে। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ২৩ মিনিটে (লন্ডনের সময় বিকেল ৪টা ২৩ মিনিট) লন্ডনের হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন আনিসুল হক।
কাল দুপুরে বনানীর বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা যায়, সদর দরজা বন্ধ করে ভেতরে নিশ্চুপ বসে রয়েছেন দুজন নিরাপত্তাকর্মী। পুরো বাড়ি ফাঁকা, নিস্তব্ধ। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন আনিসুল হকের বাড়িতে গিয়ে কেঁদেছেন অঝোরে। একজন নিরাপত্তাকর্মী জানালেন, সকাল থেকে কয়েকজন প্রতিবেশী এসে জানতে চেয়েছে, লাশ কখন আসবে। রাস্তায় কয়েকজন রিকশাচালকও প্রতিবেদকের কাছে জানতে চায় আনিসুল হকের মৃত্যুর খবর। গুলশানে উত্তর সিটি করপোরেশনের কার্যালয়েও শোকের ছায়া। মেয়রের মৃত্যুর খবর শুনে ছুটির দিনেও ছুটে আসেন কর্মকর্তারা। তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে একটি বড় ব্যানার কার্যালয়ের সামনে টানানোর প্রস্তুতি চলছিল সেখানে।
‘স্মৃতিভারে আমি পড়ে’ : ১৯৫২ সালে জন্ম নেওয়া আনিসুল হকের বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেলেন। বাবাকে নিয়ে ফেসবুকের স্ট্যাটাসগুলো দেখে কেঁদেছেন ছেলে নাভিদুল হক। লিখেছেন, ‘আব্বু যখন তুমি বেহেশত থেকে তাকাবে, তখন দেখবে লাখ লাখ মানুষ তোমাকে মনে করছে। আমি অনেক ভাগ্যবান তোমার মতো একজন কিংবদন্তিকে বাবা হিসেবে পেয়ে। ’ ‘বন্ধু আনিস অনেক অসমাপ্ত কাজ রেখে গেছে। এবার আরো অনেক কাজ করার নতুন অধ্যায় শুরু হলো...’ আনিসুল হককে ‘বন্ধু’ উল্লেখ করে ফেসবুকে এভাবেই স্ট্যাটাস দিয়েছেন তাঁর স্ত্রী রুবানা হক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শা-জাহান’ থেকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, ‘প্রিয়া তারে রাখিল না, রাজ্য তারে ছাড়ি দিল পথ, রুধিল না সমুদ্র পর্বত। আজি তার রথ/চলিয়াছে রাত্রির আহ্বানে/নক্ষত্রের গানে/প্রভাতের সিংহদ্বার-পানে। তাই/স্মৃতিভারে আমি পড়ে আছি, ভারমুক্ত সে এখানে নাই। ’
আনিসুল হক পরম মমতায় নিজের মেয়ের মতো আপন করে নিয়েছিলেন পুত্রবধূ নাভিলা সাজ্জাদকে। আবেগঘন পোস্টে শ্বশুরের স্মৃতিচারণা করলেন নাভিলা। গতকাল তিনি ফেসবুকে লেখেন, ‘তিনি সব সময়ই চাইতেন, আমি যেন তার মেয়ের মতো থাকি। নাভিলের সঙ্গে বিয়ের মুহূর্ত থেকে তিনি অপার স্নেহের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন আমার দিকে। ’ লম্বা পোস্টে তিনি আরো লিখেছেন, ‘তিনি ছিলেন লক্ষ মানুষের প্রেরণার উৎস...আমি জানি, আব্বু একজন মহান মানুষ, যাকে তরুণরা যুগ যুগ ধরে স্মরণ করবে। ’
‘স্বপ্ন পূরণ হবেই’ উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, ‘যাঁর অনেক কিছু দেওয়ার ছিল। দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসে থাকেননি। কাজও শুরু করেছিলেন। অবিরাম গতিতে যিনি ছুটে চলছিলেন, তিনি আনিসুল হক। নগরীর অনেক কাজ অসমাপ্ত রেখেই তিনি নিয়তির অমোঘ বিধান মেনে চলে গেলেন। তাঁর স্বপ্ন পূরণ হবেই, আমরা করবই। ’
ঢাকার রূপ পাল্টাতে স্থপতি মোবাশ্বের হোসেনের সঙ্গে অনেক পরিকল্পনা করেছেন আনিসুল হক। সেই স্মৃতি স্মরণ করে কালের কণ্ঠকে মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘ছোট থেকে ওপরে উঠে আসার প্রতিটি ক্ষেত্র লক্ষ করলে তাঁকে একজন সফল মানুষ হিসেবে দেখব। জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক থেকে সফল উদ্যোক্তা, দক্ষ মেয়র। ’ প্রায় ২৫ বছর ধরে আনিসুল হককে কাছ থেকে দেখা ব্যবসায়ী আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ‘তাঁর সবচেয়ে বিউটিনেস হলো লিডারশিপ ও মনের পরিচ্ছন্নতা। ব্যবসায়ী হিসেবে পোশাক খাত ও বিজিএমইএকে তিনি অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। মেয়র হিসেবে গুলশান, বনানী, বারিধারাসহ ঢাকা উত্তরের বিভিন্ন এলাকাকে তিনি পাল্টে দিয়েছেন। অতি অল্প সময়ে এই ক্ষণজন্মা মেয়রকে তাঁর কর্মের জন্য স্মরণ করবে দীর্ঘকাল। ’
স্থপতি রবিউল হুসাইন বলেন, ‘তিনি তারুণ্যের প্রতীক। তাঁর মৃত্যুতে নগরবাসীর বিরাট সুযোগ হাতছাড়া হলো। তাঁর শূন্যতা পূরণ করা কঠিন হবে। সৃষ্টিশীল গুণ ছিল তাঁর মধ্যে। তিনি স্বপ্ন দেখাতে পেরেছেন, স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছিলেন। শেষটা করতে পারলেন না। যেটুকু করেছেন, তাতেই মৃত্যুর পর মানুষের মনে জীবিত থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে আনিসের। ’
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের অন্যতম সদস্য মফিদুল হকের দৃষ্টিতে মেয়র হওয়ার পর আনিসুল হক নতুন গতিপথ দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘রাজনীতির বৃত্ত থেকে বের হয়ে ভিন্ন কিছু দেখানো শুরু করেছিলেন। তাঁর মধ্যে যে দূরদৃষ্টি ও পেশাদারি ছিল, এমন মেয়র আমরা সহজে পাব না। ’
মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, এলজিআরডি মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আব্দুল আউয়াল মিন্টু, তাবিথ আউয়াল, জোনায়েদ সাকিসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘আমি তাঁকে লম্বা সময় ধরে চিনি। তিনি ছিলেন অদ্বিতীয় একজন, কঠোর পরিশ্রমী, নিবেদিতপ্রাণ ও সত্যিকার অর্থেই জনগণের একজন। তাঁর অবদান অনেক। তিনি চিরশান্তিতে থাকুন এবং আল্লাহ রুবানা, তাঁর সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের শক্তি দান করুন। ’
দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই তার সাবেক সভাপতির মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছে। শোকবার্তায় সংগঠনটি বলেছে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে আনিসুল হকের অসামান্য অবদান সহকর্মীরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। মেয়র হিসেবে রাজধানীর উন্নয়নে তাঁর প্রগতিশীল কার্যক্রম ঢাকাবাসীসহ সারা দেশের মানুষ দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
বিজিএমইএ গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছে, আনিসুল হকের এই প্রয়াণে দেশ শুধু একজন সফল শিল্প উদ্যোক্তা নয়, বরং একজন সমাজসেবক, একজন দেশপ্রেমিক, মানুষের জন্য নিবেদিত এক প্রাণ হারিয়েছে। ক্ষণজন্মা এই মেয়র গত আড়াই বছরে অনেক প্রতিশ্রুতি যেভাবে পূরণ করেছেন, তা জাতি চিরকাল স্মরণ করবে। তাঁর মৃত্যুতে জাতীয় জীবনে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়।
কাউন্সিলরদের চোখে : ‘উনি আমাদের ডেকে নানা বিষয়ে পরামর্শ করতেন। আমাদের কাছে জানতে চাইতেন কিভাবে ওয়ার্ডটিকে সাজাতে চাই। আমাদের পরিকল্পনাকে তিনি গুরুত্ব দিতেন। আর বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ দখলদারদের কাছে আনিসুল হক ছিলেন এক আতঙ্কের নাম। দখলদাররা সব সময় ভয়ে থাকতেন কখন তাঁদের বিরুদ্ধে মেয়র সাহেব ব্যবস্থা নেন। ’ কালের কণ্ঠকে বলছিলেন ঢাকা উত্তরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জামাল মোস্তফা। ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কাজী জহিরুল ইসলাম মানিক বলেন, ‘ঢাকায় আমরা নিয়ম ভাঙতে ভাঙতে অনিয়মে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। যানজটসহ নানা সমস্যায় ঢাকা প্রায় পরিত্যক্ত নগরে পরিণত হতে চলেছিল। এ থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমত ছিলেন মেয়র আনিসুল হক। উনি ঢাকাকে নতুনভাবে গড়তে যে মাস্টারপ্ল্যান করেছিলেন, এটা যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি তাহলে তাঁর জন্য কিছু করা হবে। ’ ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. সফিউল্লা বলেন, ‘আমাদের কথা বাদ দিলাম, সাধারণ মানুষ উনার জন্য শোক জানাচ্ছে। অনেকেই আফসোস করছে। ’ ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোবাশ্বের চৌধুরী বলেন, ‘আমার রাজনৈতিক জীবনে আনিসুল হকের সঙ্গে পরিচয় ছিল একজন ব্যতিক্রমী মানুষের সঙ্গে পরিচয়। যানজট কমিয়ে আনা, অবৈধ দখলদারমুক্ত করা, ঢাকার সবুজায়ন, এসবের মধ্য দিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকার চেহারা তিনি বদলে দিয়েছেন। জীবনে কোথাও হার না মানুষটি শেষ পর্যন্ত অসুস্থতার কাছে হার মেনে আমাদের কাঁদিয়ে বিদায় নিলেন। কিন্তু তাঁর কর্মের জন্য ঢাকাবাসী তাঁকে মনে রাখবে। ’
ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে লাখো স্ট্যাটাস, সাধারণ মানুষের নিঃশব্দের আহাজারি ঢাকার ইট-পাথরগুলোকেও যেন শোকগ্রস্ত করে তুলছে।
২০১৫ সালের ৬ মে ডিএনসিসির মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ে নগরবাসীর মনে জায়গা করে নেওয়ার অসংখ্য কর্ম করে গেছেন মেয়র আনিসুল হক। ঢাকার মানুষ যাতে আকাশ দেখতে পারে, সে জন্য অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণ করেছেন। প্রভাবশালী দেশের দূতাবাসের দখল থেকে ফুটপাত মুক্ত করে হাঁটার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। বাস টার্মিনাল, বাসস্ট্যান্ডসহ ঢাকায় অন্তত ৫০০ টয়লেট স্থাপন করেছেন ফাইভ স্টার মানের। এমন উচ্চমানের টয়লেট ঢাকার অনেক উচ্চবিত্তের বাসাবাড়িতেও নেই। পরিচ্ছন্ন ঢাকা আর সবুজ ঢাকা গড়াই ছিল তাঁর স্বপ্ন। ফুট ওভারব্রিজে ফুলগাছ লাগানো শুরু করেছিলেন, ঢাকার রাস্তাগুলোকে দুর্গন্ধময় ময়লা-আবর্জনামুক্ত রাখার কাজ করছিলেন। প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষুকে পরোয়া না করে তেজগাঁওয়ের অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করে রাস্তাটি সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, উচ্ছেদ করেছেন গাবতলী টার্মিনালের সামনের রাস্তার অবৈধ দখলদারদেরও। ঢাকার মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগ কমাতে চার হাজার বাস নামানোর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন রাত-দিন খেটে ঢাকাকে সত্যিকারের বাসযোগ্য নগরে রূপ দেওয়ার এই দক্ষ কারিগর।a
