পঞ্চাশোর্ধ লম্বা, সুঠামদেহী, ফর্সা সাদা শাড়ি পরা এক মহিলা রুমে ঢুকে বার বার একই কথা বলছেন।
"আমার যাদু পাগল না, আমার যাদু পাগল না। কে বলে আমার যাদু পাগল। কে বলে। স্যার, দেখেন দেখেন কি সুন্দর চাঁদের মতো দেখতে আমার ছেলে। আপনিই বলেন, আমার যাদুর মতো দেখতে সুন্দর এ রকম একটা চাঁদের টুকরো ছেলে ক'টা পাবেন এশহরে...। বলেন, বলেন...। আর ওই পাঁজি মেয়েটা বলে, আমার ছেলে নাকি পাগল। বজ্জাৎ একটা মেয়ে..."
হন হন করে আমার চেম্বারে ঢুকে কথা গুলো বলছেন মহিলা। আমি বললাম, বসুন বসুন, কি হয়েছে?
তিনি বসলেন ছেলেকেও পাশের চেয়ারে বসালেন, কিন্তু কথা বন্ধ করলেন না। বলতেই থাকলেন....
"....বিয়ের সময়তো নিজেরা সবাই উতলা হয়ে গিয়ে বিয়ে করছিলে আমার যাদুরে। আমি কি তোমাদের কাছে যেচে গিয়ে বলে ছিলাম, আমার চাঁদের টুকরো'র মতো একটা ছেলে আছে। তার সাথেই তোমাদের মেয়েটিকে মানাবে। তোমরাই না গুস্টি শুদ্ধ সব আমার হাতে পায়ে ধরলে, আমার ছেলে কে জামাই করবে বলে।
'আহা কি সুন্দর ছেলে, কি ভদ্র ছেলে। ওমন সুন্দর, নম্র, ভদ্র, চরিত্রবান ছেলে কালে ভদ্রে চোখে লাগে।... এখন কার ছেলেগুলো কি মিছকে শয়তান। কাজ কাম নাই, একশোটা মেয়ের পিছনে কেবল ঘুর ঘুর করে। দোহাই বেয়াই সাহেবা, আর না কইরেন না। এই ছেলে কে আমাদের মেয়ের সাথে খুব মানাবে। বেয়াই সাহেবা দোহাই আর না কইরেন না...মনে নেই মনে নেই সেসব...,তবে এখন কেনো পাগল বলছো আমার ছেলেকে..,কি করেছে আমার ছেলে"
আমি বললাম,
কি হয়েছে, চাচী। প্লিজ একটু বসুন শান্ত হন,আমি দেখছি।
"...না না আমি শান্ত হবোনা। ওরা কি পেয়েছে। আমি কত্ত করে বললাম, না না না। লাগবেনা আমার ওমন লন্ডনী বিদেশী মেয়ে মেয়ে, আমি আমার ছেলেকে কোন বিদেশী মেয়ের সাথে বিয়ে দিবোনা। আমি আমার ছেলেকে হারাতে চাইনা...। কিন্তু..., কিন্তু তোমরাই তো সব একেবারে হাতে পায়ে ধরে মিনতি করে বিয়ের জন্যে উতলা হলে। তোমাদের মেয়ে নাকি মানছেই না। নাওয়া খাওয়া বন্ধ করেছে। একেবারে লাইলী হয়ে গেছে। হাহ...! লাইলী। কোথায় গেলো লাইলী গীরি। আর এখন বলে কিনা, "ছেলে পাগল"। কেনো বাবা, বনি বনা হয়না চলে যাও, ডিভোর্স দিয়ে চলে যাও। অসুবিধা নেই। আমার কলিজার টুকরো এরকম রাজপুত্রের জন্যে ওমন মেয়ের অভাব হবেনা। মিছে মিছি অপবাদ দিচ্ছো কেনো, পাগল বলছো কেনো? আল্লাহর গজব পড়বে তোমাদের উপর..,
...আয় বাবা, আয় আমার কোলে আয়। কে বলেছে তুই পাগল। এই দ্যাখ, ডাক্তারের কাছে তোকে নিয়ে এসেছি। ডাক্তার সাহেবই বলবে, তুই পাগল কিনা..."। মহিলা এবার ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলেন ছেলের মাথাটাকে কোলে রেখে।
আমি তাকে আবারো শান্ত হতে বললাম,
"..প্লিজ চাচী, বসুন। আমি দেখছি। কে বলেছে আপনার ছেলে পাগল। সত্যিতো কত্ত সুন্দর ছেলে আপনার। এরকম সুন্দর ছেলে আমি খুব কম দেখেছি। আপনি বসুন। আপনার ছেলে পাগল নয়, ও ভালো। ও সুস্থ। কোন হতচ্ছাড়ার এমন স্পর্ধা যে, এমন চাঁদের টুকরো ছেলেকে পাগল বলে। আপনি বসুন, প্লিজ..."।
মহিলা এবার থামলেন। বসে বসে নিরবে চোখের জ্বল মুছতে লাগলেন।
ভদ্র মহিলার বয়স পঞ্চাশ এর কাছা কাছি। মাথায় কাপড় দেয়া। সাদা কালো চুল গুলো কপাল ঢেকে রেখেছে আধটা। দেখতে তাকে বেশ সম্ভ্রান্ত, বনেদী ঘরের লাগছে। তিনি ছেলেকে নিয়ে এসেছেন আমার চেম্বারে। গেলো কদিন থেকে ছেলেটি নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। চুপচাপ হয়ে গেছে। কিছু উল্টো পালটা আচরন করছে।আগে থেকে কিছু ওষুধ খাচ্ছিলো, সেগুলো ও এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটা তাকে না জানিয়ে করা হয়েছে । ওষুধ বন্ধ করার বিষয়টি তিনি জানতেন না। আসার সময় বউই বলেছে,
"মা আমি আর পারবোনা আপনাদের ছেলে কে নিয়ে থাকতে। আপনার ছেলে একটা পাগল। বিয়ের পর থেকেই তিনি কিসব উল্টোপাল্টা করছেন। কথা বলেন না। চুপ হয়ে গেছেন। একে বারেই চুপ। কথা দুএকটা যাও বলছেন সেগুলো একেবারে অসংলগ্ন, বাস্তবের সাথে মিল নেই। রাতে আবার ঘর থেকে বেরিয়ে যান। বেরিয়ে গিয়ে কবরের পাশে বসে থাকেন। নতুন বউ ঘরে রেখে জামাই বের হয়ে গিয়ে কবরে বসে থাকেন, এটা কোথাও শুনেছেন। আমি আর পারবোনা এসব। পারবোনা পাগলের সংসার করতে, আর নিয়ম ধরে রোজ রোজ ওষুধ খাওয়াতে।
চাচী ছেলে কি নতুন বিয়ে করিয়েছেন...?
"...হ্যা, বাবা। গত মাসেই ধুমধাম করে ছেলের বিয়ে হয়েছে। আমি রাজী ছিলাম না। কিন্তু সবার অনুরোধ, চাপাচাপি তে শেষতক রাজী হই। বিয়ের আগ পর্যন্ত ও ভালো ছিলো। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই আবার হঠাৎ কি হতে কি হয়ে গেলা। সব একেবারে উলট পালট..।
ছেলেটি আমার সামনে বসে রইলো চুপচাপ । কোন কথা বলছেনা। বয়স আনুমানিক বাইশ কি তাইশ হবে। বেশ লম্বা, ধবধবে ফর্সা, সুঠাম দেহী। মনে হয় জিম টিম করে নিয়মিত । বাশির মতো খাড়া নাক, ঠোট গুলো ঈশৎ গোলাপি, চিকন ভ্রু। বিস্তৃত কপাল। কুচকুচে কালো কোকড়ানো চুল, চুলগুলো চমৎকার পরিপাটী করে আঁচড়ানো। এরকম সুন্দর ছেলে খুব কম দেখা যায়। অনেকটা ফিলিস্তিন বা কাশ্মীর অঞ্চলের যুবক দের মতো। মায়ের সাথে তার চেহারা আর গড়নের অসম্ভব মিল। মনে হচ্ছে বিধাতা মায়ের এনে মুখটাকেই বসিয়ে দিয়েছেন ।
মাকে জিজ্ঞেস করলাম,
কি ব্যাপার চাচী। আপনার ছেলে আর ছেলের নতুন বউ ঝগড়া করছে বুঝি...?
".... ঝগড়া কিনা জানিনা বাবা, কাল বউ আমার চাঁদের টুকরা, আমার কইলজা ছেড়া বুকের ধন, একমাত্র ছেলেকে পাগল বলেছে। আমার ছেলে নাকি পাগল। কি বলবো...! এমন অপবাদে মনে হচ্ছে কে যেনো আমার কইলজাটা'তে একটা পেরেক ঢুকিয়ে দিয়েছে....."
আমি বললাম,
চাচী বাদ দেন ওসব, ছেলের দিকে তাকিয়ে বললাম, কি নাম বাপু তোমার । কি হয়েছে ..?
সে চুপচাপ বসে আছে। এদিক ওদিক দিকে তাকাচ্ছে। বড় বড় সুন্দর ডাগর চোখ। কেবল সুন্দর ডাগর বললে কম হবে। অপূর্ব তার চাহনী। এ বয়সি হাজার খানেক ছেলেকে সারি বদ্ধ ভাবে দাড় করিয়ে রাখলে কেবল তার সুন্দর চোখ, ভ্রু জুগল, আর দেহৈক গড়ন দেখে এক নিমিষেই তাকে আলাদা করা যাবে । তার উপর একেবারে ফর্সা। ফর্সা ও না। গোলাপি আভা ছড়ানো ফর্সা। ফর্সা মানুষ দের চামড়ায় মেলানিন কম থাকে, চামড়ার নীচে আঁকাবাঁকা লতার মতো নীলাভ রক্ত নালী গুলো ভেসে থাকে। এরকম মানুষ কে দেখতে আবার অনেক সময় ঈশৎ গোলাপিও লাগে। এছাড়া রাগলে বা অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে মুখে রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যায়। সেজন্যে তাদের অনেক সময় টকটকে লাল আপেলের মতো দেখায়। ছেলেটির ও ঠিক এরকম।
"এঞ্জেল ম্যান সিন্ড্রোম" বলে ব্রেনের একটা রোগ আছে। বেবী টি দেখতে এতো সুন্দর হয়, মনে হয় যেনো সৃষ্টি কর্তা নিজ হাতে গড়ে স্বর্গ থেকে এই মাত্র পাঠিয়েছেন। এঞ্জেল ম্যান সিন্ড্রোম এর রোগী দেখতে এঞ্জেল এর মতো সুন্দর বলেই রোগটির নাম দেয়া হয়েছে এঞ্জেল ম্যান সিন্ড্রম। অথচ অবাক করার বিষয়, রোগ বলতে তার মধ্যে অটিজমের কিছু ফিচার থাকে। এ ছেলেটিকে দেখেই আমার এঞ্জেল ম্যান সিন্ড্রোম রোগের কথা মনে পড়লো। এতো সুন্দর ছেলে কিন্তু তার মাঝে আল্লাহ তায়লা হঠাৎ কি এক রহস্যময় রোগ দিয়ে দিয়েছেন যে সদ্য বিয়ে করা বউ অধৈর্য হয়ে বলেছে, "এ ছেলে পাগল"। যদিও এভাবে বলাটা তার ঠিক হয়নি। ছেলেটির মা'তো এটা একেবারে মানতেই পারছেনা। ছেলের মা কেনো, একে দেখে আমারও সন্দেহ হচ্ছে এর আবার কি মানসিক সমস্যা হবে। এঞ্জেল এর মত দেখতে ছেলেটি , অথচ তার মনে আল্লাহ এমন রোগ দেখা দিয়েছেন যে,তার বউ বলেছে সে চলে যাবে।
যাক গে, নির্মম সত্য হলো মানসিক রোগী দের এক সময় সবাই এক এক করে ছেড়ে চলে যায়। কেবল মাত্র "মা" ছাড়া। একমাত্র মা ই তার ছেলে বা মেয়েকে ছেড়ে যান না, সে যত বড় অসুখ ই হোক না কেনো। মা'রা খুব ধৈর্য ধরে আজীবন আগলে রাখেন মানসিক রোগাগ্রস্ত সন্তানটি কে। এক বুক আশা নিয়ে স্বপ্ন দেখেন, একদিন হয়তো সে সুস্থ হয়ে যাবে। ভেংগে পড়েন না কখনো।
কিন্তু এই ছেলেটির মা বেশ ভেংগে পড়েছেন। ছেলেকে পাগল বলায় ভিষন রি-একশন হয়েছে তার মধ্যে। এটা তিনি কোন ভাবেই মানতে পারছেন না। এতে তিনি খুব কস্ট পেয়েছেন। কস্ট পাওয়ারই কথা। এতো সুন্দর একটা ছেলেকে পাগল বললে, মা কেনো যে কারোর ই খারাপ লাগবে। তাছাড়া মানসিক রোগী কে পাগল বলাটাও তো ঠিক না। এটা এক ধরনের অন্যায়, মূর্খতা, জঘন্য অপরাধ যা আমাদের সমাজে চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।
আমি বুঝলাম ভদ্র মহিলার এমন রিএকশন এর ও হয়তোবা কোন কারন আছে। কেননা অনেক মায়েরাই তো মানসিক রোগাগ্রস্ত ছেলে বা মেয়ে নিয়ে নিয়োমিতো আসছেন চেম্বারে। কিন্তু উনার মতো আর রি একশন করেন নি বা করছেন না কেউ কখনো।
যাক ছেলেটি এখনো চুপ চাপ আমার সামনে বসে আছে। আমার প্রশ্নের কোন জবাবই দিচ্ছেনা। কেবল বড় বড় চোখ দিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। চুপ থাকায় শেষতক মা'ই বললেন,
"...বাপরে ,আমার যাদু। কথা বলো বাপ। স্যার তোমাকে জিজ্ঞেস করছেন তোমার নাম। বলো বাপ। তোমার নাম বলো", মায়ের গলাটা ধরে আসলো।
ছেলেটি মায়ের দিকে তাকায়। মা ঈশারা করেন,
"নাম... নাম। নাম বলতে বলেছেন যাদু, ভয় নাই..। বলো বলো তোমার নাম..।
ছেলে আস্তে করে বললো,
নাম..? মায়ের মুখ খুশিতে চক চক করে উঠলো, তিনি বললেন,
...হ্যা যাদু তোমার নামটি বলো!
নাম...? আমার নাম , আমার নাম....হুম..., মা আমার নাম টা কি। আমি ভুলে গেছি মা। তুমি বলে দাও..।
...যাদুরে যাদু। কি হলো তোর। তোর নাম "কিরণ"। বল, "কিরণ আমার নাম"। মা বললেন।
তাই...। হ্যা..., মনে হয় আমার নাম কিরণ। মা তুমি কাঁদো কেনো..।
আমি বললাম, কিরণ তোমার নাম? গুড , কিরণ বলো কি তোমার সমস্যা?
আমার...?..কই, আমার কিছু হয়নিতো..।এই বললে কিরণ এবার চেয়ার ছেড়ে উটে চলে যেতে চাইলো। তার মা ই দপ করে তার হাতে ধরে আবার বসিয়ে দিলেন।
"যাসনে বাপ আমার, যাসনে। বস। স্যার তোকে ভালো করে দিবেন। তুই বস..."।
কিরণ আবার আমার সামনে বসে। আমি আপাদমস্তক দেখলাম। জিন্সের প্যান্ট, সাদা টি শার্ট, ক্যাটস। ড্যাম স্মার্ট বলা যায়। কিন্তু ব্যাপার টা কি। আমি মেলাতে পারলাম না কিছু। আমি কিরণের মাকে বললাম,
চাচী কিরণ তো কিছু বলছে না, আমি আপনার সাথে একটু বিস্তারিত কথা বলতে চাই...
জ্বি বাবা বলেন, আপনিও আমার ছেলের মতো। বলেন কি জানতে চান...?
আমাকে কি একটু খুলে বলবেন সব। আপনার আর আপনার ছেলের ব্যাপারে...।
"...বাবা কি বলবো। যাদুটা আমার একমাত্র ছেলে। চোখের মনি। দেখছেন কি সুন্দর চাঁদের একটা টুকরা। সবকিছুই তো ভালো চলে যাচ্ছিল। কেবল বছর দুয়েক আগে একবার তার হঠাৎ একটা সমস্যা হয়। সেবার দোকান থেকে এসেই সে বললো,
"...মাগো, ইদানিং আমি শব্দ শুনি। আলগা শব্দ। কেউ না থাকলেও শুনি। আমার কানে কানে কে যেনো কথা বলে। অনবরত কথা বলে...
আমি বললাম,
".. কি কও যাদু। কে কথা কয় তোমার সাথে"
সে বললো,
"....না মা আমি জানিনা। কিন্তু কথা শুনি মা। আলগা কথা।মাঝে মাঝে ভয় ও হয় মা।
ধীরে ধীরে তার সমস্যা আরো বাড়তে থাকে। সে ঘরে একা থাকা শুরু করে। একা একা কথা বলতে শুরু করলো। ঘর থেকে বাইরে বের হওয়া বন্ধ করে দেয়। তার দুটো ব্যবসা আর অনেক গুলো দোকান ছিলো। বেশ ভালো ব্যবসা করতে পারতো সে। ব্যবসা গুলো সবই তার নিজের হাতে গড়া। ধীরে ধীরে ব্যবসা গুলো সে অন্যের কাছে দিয়ে দিতে থাকে। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। সব কিছু কেমন যেনো উলট পালট হতে লাগলো আমার কাছে। ভাবলাম চাঁদের টুকরোর মতো আমার ছেলেকে হয়তো নজর টজর দিয়ে কেউ যাদু টোনা করেছে। কিংবা পরী টরী আছর করেছে।
আমি বিভিন্ন পীর, মাজারে গেলাম ছেলেকে নিয়ে। অনেক মোল্লা মুনসি দেখালাম। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। সমস্যা আরো বাড়তে থাকে। এমন সময় এক মৌলভী বলেন, আপনার ছেলেকে ব্রেইনের ডাক্তার দেখান। মনে হয় ওর ব্রেনে কিছু সমস্যা হচ্ছে। যাদু টোনা পরী এসব কিছুনা...।
আমার অনুরোধে হুজুর একটা তাবীজ দিলেন। পানি পড়া দিলেন বটে। কিন্তু বার বার একটা কথা বললেন, "ব্রেনের ডাক্তারের কাছে যান.."।
আমি পরে একজন ব্রেনের ডাক্তারের কাছে যাই। তিনি সব দেখে টেখে বলেন, ওর ব্রেনে কিছু সমস্যা হয়েছে। তবে সমস্যা টা আগে থেকেই নাকি ছিলো। প্রকাশ হয়নি। অনেক যত্ন, আদর, সোহাগ আর ভালোবাসার মধ্যে ছিলো, তাই তা কখনোই প্রকাশ হয়নি।
ডাক্তার সাহেব আমাকে বুঝালেন, একের পর এক ব্যবসা, বানিজ্য, দোকান এসব করতে যেয়ে তার মন আর শরীরের উপর দিয়ে অনেক ধকল আর পরিশ্রম যাচ্ছিলো। বেশ অঘুমা আর টেনশন ও তাকে পেয়ে বসছিলো। তাছাড়া কিছু মেয়েও নাকি তাকে রাত বিরাত ফোন দিয়ে ডিস্টার্ব করছিলো। উল্টো পালটা কথা বলছিলো। ভয় দেখাচ্ছিলো। এজন্যে সে ঘুমাতে পারতোনা। যেটা সে ডাক্তারের কাছে খুলে বলে। এসব স্ট্রেস তার মনের উপর খুব প্রভাব করেছে। তাছাড়া যেহেতু তার রক্তের (জ্বিনের) মধ্যে মানসিক রোগ টা ছিলো, তাই হঠাৎ একসাথে এতগুলো স্ট্রেসে কে একসাথে সে মানিয়ে নিতে পারেনি। সেজন্যে নাকি রোগটা প্রকাশ প্রকাশ পেতে শুরু করছিলো।
অনেক ভালো ডাক্তার ছিলেন। আমাকে তিনি খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে বলেছিলেন। দু তিন বার তার কাছে যাই ছেলেকে নিয়ে। তিনি প্রতিবার সময় নিয়ে তার সাথে কথা বলতেন, গল্প করতেন।কিছু ওষুধ দেন। এতে তার ঘুম বাড়ে। সে সেরে যেতে থাকে।
তিনি আরোও বলেন,সে যেনো পরিমিতো ঘুমায়। বিশ্রাম নেয়। কোন স্ট্রেস যাতে না নেয়।
ডাক্তার স্যারের ওষুধ আর উপদেশে সে এক সময় ভালো হয়ে যায়। তার কানে কানে আর আর কোন গায়েবি বা আলগা শব্দ আসেনা। তার ভয় ও কমে যায়। আবার সে ব্যবসা বানিজ্যে চলে যায়। তবে তিনি একটি ওষুধ চালিয়ে যেতে বলেন। এবং বলেন, তার নির্দেশ ছাড়া যেনো বন্ধ না। আমি তাই করেও যাচ্ছিলাম। রোজ সকালে নাস্তার পর একটা ট্যাবলেট তাকে খাওয়াতাম। এক দিন ও বাদ হয়নি।
এখনকার এই সমস্যা দেখা দিয়েছে গত মাসে ছেলের বিয়ের পর থেকে। বিয়েতে আমি রাজী ছিলাম না। কিন্তু কোত্থেকে এসে এক লন্ডনী মেয়ে আমার ছেলেকে দেখে একেবারে দেওয়ানা হয়ে যায়। আসলে মেয়েটি স্বপরিবারে দেশে আসে তার বিয়ের উদ্দ্যেশে। তারা ছেলে খুজতে থাকে। সুন্দর, সুঠাম, সৎচরিত্রবান ছেলে। হঠাৎ তারা একদিন আমার ছেলের দোকানে আসে কেনাকাটা করতে। ওখানেই মেয়েটি আমার ছেলের সাথে পরিচিতো হয়। কেনা কাটা করে যাবার সময় দোকানে মেয়েটি ভুল ক্রমে তার মোবাইল ফেলে যায়। আমার যাদু তাদের ফোন দিয়ে সেটা ফেরত নিতে বলে। পরের দিন মেয়েটি ফোন নিতে আসে, সেই থেকে পরিচয়। আমার ছেলেকে দেখে ভালোলাগে মেয়েটির। সে তার মা বাবা এটা খুলে বলে। তাদেরও ভালো লাগে। ভালো লাগার ই কথা। আপনিই তো দেখছেন আমার যাদু কে।
ওরা সবাই আলাপ নিয়ে আমার বাসায় আসতে থাকে। আমি রাজী হইনা। আমি তাদের বললাম, আমার ছেলে এখন বিয়ে করবেনা। আরো বললাম আমার ছেলের ব্রেনে একটু সমস্যা আছে। তারা বিশ্বাস করলননা। জিগ্যেস করলেন কি সমস্যা। আমি বললাম সব। কিন্তু তারা তাও বিশ্বাস করলেন না। হেসে উড়িয়ে দিলেন।
তারা বললেন, এগূলো টুকটাক সুন্দর ছেলে দের থাকলে, আর প্রেমে টেমে পড়লে বা বিয়ের ভুত মাথায় চাপ চাপলে তা বেড়ে যায়। আমি ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেখাই। তারা বললো কোন অসুবিধা নেই, বেয়াই সাহেবা। আমরা সব দায়িত্ব নিলাম। যদি কোন সমস্যা হয় আমরা লন্ডনে ওকে সিকিয়াট্রিস্ট দেখিয়ে চিকিৎসা করাবো। আপনি শুধু হ্যা বলেন। আপনার চাঁদের টুকরো কে আমাদের চাই ই চাই।
আমার মন তাদের কথায় সায় দেয়না। তারাও আমার পিছু ছাড়েনা। তাছাড়া আমিও চাইছিলাম না কোন বিদেশি মেয়েকে আমার ঘরের বউ করবো। কারন আমার কইলজার টুকরা একটা। একটাই যক্ষের ধন। ওই আমার জীবন, ওই আমার মরন। ওর জন্যই আমি বেঁচে ছিলাম। না হলে কবি আমি আত্মহত্যা করতাম। তাদের কথায় আমি ছেলেকে ডেকে এক রাতে জিজ্ঞেস করলাম বাবা,
তুই বল। তুই যদি বলিস মেয়েটিকে তোর পছন্দ তাহলে আমি আর না করবো না। তোর সুখ ই আমার সুখ। আমার ছেলে একটু সাদাসিধা। লাজুক। ও কিছু বলেনা। আমি ভাবলাম মনে হয় সেও রাজী...। তিনি থামলেন।
তারপর..
আমার একটাই কইলজার টুকরা। তার বাবা নাই। ও যখন ছ'মাসে গর্ভে তখন এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাবা..... ।
সড়ক দুর্ঘটনা? মানে চাচী বুঝলাম না। কি ব্যাপার একটু খুলে বলবেন...
বাবা থাক এসব দুখের কাহিনী। যা গেছে তা টেনে আর কি হবে।
তারপরও যদি একটু বলতেন চাচী। মানসিক রোগের চিকিৎসা করতে গেলে অনেক সময় রোগীর সম্পর্কে যেমন জানতে হয় তেমনি তার ফ্যামেলী সম্পর্কেও টুকটাক জানতে হয়। আপনি খুলে বললে আমার জন্যে ভালো হয়।
আহ...বলে মহিলা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন...
তার পর শুরু করলেন।
খুব অল্প বয়সে বাবা আমার বিয়ে হয়। আঠারো কি উনিষ। আসলে বাবা কি বলবো, আমি নাকি ছোট বেলা থেকেই দেখতে খুব সুন্দর ছিলাম। আমাকে সবাই "ইরানী" মেয়ে বলতো। রাস্তা দিয়ে হাটতে গেলে সব সহ পাঠিরা বলতো ঐ যে ইরানী যায়। আমাকে নিয়ে আমার মা বাবা সবার খুব অসুবিধা পোহাতে হচ্ছিলো। প্রতিদিন ঘঠক আলাপ নিয়ে আসতো। সকালে এক ঘঠক তো বিকালে এক ঘঠক। ঘঠকে ঘঠকে মারামারি, হাতাহাতি। কতো আর এসব ঝামেলা সহ্য হয় ।
একদিন বাবাই বললেন, ঠিক আছে কি আর করা। আল্লাহ যখন দিয়ে দিয়েছেন সুন্দর মেয়ে, রাস্থায় বের হলেই তো সবার নজরে পড়বেই। আর মেয়ে হয়েছে যেহেতু,পরের ঘরে একদিন যেতেই হবে, দুদিন আগে না হয় দুদিন পরে। তাইলে কি দরকার এতো ঝক্কি ঝামেলার। দেখেশুনে দিয়েই দেই বিয়ে। অনেক সময় সুন্দর ই মানুষের জীবনে কাল হয়ে যায়। দিন কাল খারাপ, কিনা কি হয়।
আমার বিয়ে হয়ে যায়। ওর বাবা আমাদের আত্মীয়ের মধ্যেই ছিলেন। খুব ভালো মানুষ। উনিও আমার মতো লম্বা চওড়া আর ফর্সা ছিলেন। আমরা যখন দুজন রাস্তা দিয়ে হেটে যেতাম তখন সবাই হা করে তাকিয়ে থাকতো। বলতো ঐ ইরানের বাদশাহ আর বেগম হেটে যায়। আমাদের সুখে সংসার কেটে সুন্দর ছিমছাম। বছর দুয়েকের মাথায়
একদিন আমি বাথরুমে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যাই। কিরণ তখন ছয় মাসে গর্ভে। আমার স্বামী ছিলেন বাজারে। তিনি খবর পেয়েই হোন্ডা নিয়ে রওয়ানা হন। কিন্তু পথিমধ্যে..।
ভদ্র মহিলা থেমে যান। তার চোখ জ্বলে ভিজে যাচ্ছে। পাশে বসা ছেলেটি মায়ের চোখের জ্বল মুছে দিচ্ছিলো। ও বললো, মা কাঁদছো কেনো। দেখলাম মায়ের কান্না দেখে ছেলেটির চোখের কোনে পানি জমছে শিশিরের কনার মতো।
ভদ্র মহিলা কে জিজ্ঞেস করলাম তার পর কি হলো?
আমি মাথা ঘুরে বাথরুমে পড়ে অজ্ঞান, এটা শুনে তিনি তাড়াহুড়ো করে আসতে যেয়ে পথিমধ্যে এক্সিডেন্ট করেন। একটা ট্রাক তাকে চাপা দেয়। তিন দিন অজ্ঞান থাকার পর তিনি সিলেট ওসমানী মেডেকেলে মারা যান...।
মহিলা এবার আর কোন কথা বলতে পারছেন না। তার ঠোট গুলো বোবা কান্নায় কঁপছিলো।
তারপর বলুন চাচী , কি হলো..?
তারপর কি হবে। আমি ভাগ্য কে মেনে নিলাম। সবই আল্লাহর পরীক্ষা। কদিন পর কোল জোড়ে আসে আমার এই যাদু। যাদু আমার এতো সুন্দর ছিলো যে বলার মতো না। যেনো এক টুকরো চাঁদ। একেবারে বাপের মতন। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি সব ভুলে যাই।
আমি সিদ্ধান্ত নেই আর বিয়ে করবো না। এমন চাঁদের টুকরোকে রেখে আমি কোথাও যাবোনা। আমাকে অনেক চেষ্টা করেন আমার বাবা আবার বিয়ে দেবার জন্যে। আমার জন্যে আবারো অনেক আলাপ আসতে থাকে। আবারো বেড়ে যায় ঘটকের আনাগোনা। আসলে আমি খুব সুন্দর ছিলাম। কিন্তু আমি বাবাকে বলি, বাবা আমার এই কলিজার টুকরো কে ছেড়ে কোথাও যাবোনা। লাগবেনা আমার আর বিয়ে।
আমি আর বিয়ে করিনি। কিরন কে নিয়েই আমি পড়ে থাকি। ও বড় হয় ধিরে ধীরে। আমার সব কস্ট ওকে দেখলেই মুছে যেতো। মাঝেমধ্যে ও একটু কান্না কাটি করতো, বাবা কই বাবা কই। সবারতো বাবা আছে আমার বাবা নেই কেনো। আমি তখন অকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতাম। ওর বাবার কবর দেখিয়ে বলতাম, ঐ খানে তোর বাবা শুয়ে আছে। পরকালে আমরা যখন আল্লাহর বাড়ী যাবো তকন তোর বাবার সাথে আমাদের দেখা হবে। তখন তোকে তিনি কোলে নিয়ে আদর করবেন। সে বলতো, মা চলো তাইলে আজই আল্লাহর বাড়ী
যাই। বাবাকে দেখে আসি, এই বলে বলে সে কোলেই ঘুমিয়ে পড়তো...।
আচ্ছা বাবা সত্যি কি আমার ছেলে পাগল। কেনো সবাই আমার এমন সোনার টুকরো কে পাগল বলে। আমার কলজে যে ছিড়ে যায়। এই শোনার জন্যে কি আমি বাইশটি বছর সব সাধ আহ্লাদ জলাঞ্জলি দিয়ে তিল তিল করে ছেলে কে বড় করলাম। কি দোষ আমি করলাম বাবা, কি দোষ...। তিনি অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন
আমি কিছুটা ইমোশনাল হয়ে গেয়েছিলাম। আসলে প্রতিটি ঘোরতর মানসিক রোগীদের ই এরকম কোননা কোন দুখঃজনক ইতিহাস থাকে। আমাদের স্যার অধ্যাপক গোপাল শংকর দে বলতেন, "ট্রাই টো দা এন্টার অব দি মাইন্ড", " এভরি হিসট্রি অব পেশেন্ট আর ভেরী মাচ প্যাথেটিক"।
আমি নিজেকে সামলে বললাম,
চাচী, আপনার ছেলে পাগল না। ওরা সব মুর্খ। ঘাবড়ানোর কিছু নেই।আপনার ছেলের মনের মধ্যে ছোট একটি অসুখ। এটা একটা মানসিক রোগ। আপনি ওষুধ খাওয়ান, ও ভালো থাকবে। ডায়াবেটিস, প্রেসার এগুলোতোও রোগ। এগুলো কি ভালো হয়? হয় না। এগূলো কে ওষুধ খেয়ে খেয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। মানসিক রোগ গুলোও ঠিক এমন। একে নিয়ন্ত্রনে রেখে সবই করা সম্ভব। আপনার ছেলের মানসিক রোগটাও আপনি যত্ন করে ওষুধ খাইয়ে খাইয়ে এতোদিন নিয়ন্ত্রনে রেখেছেন। কিন্তু বিয়ের সময় আপনাদের বেখেয়ালে বড় ভুল হয়ে যায়। ওর ওষুধ গুলো আপনারা কয়েকদিন বন্ধ রেখেছেন। যেটা তার ডাক্তার উপদেশ দিয়ে ছিলেন কবছর আগে। তাই তার মানসিক রোগের লক্ষন গুলো কিছুটা ফিরে এসেছে। আপনি চিন্তা করবেন না। ও ঠিক হয়ে যাবে আগের মতো। আবার সে ব্যবসা বানিজ্য করবে। আর ওর স্ত্রী কে যেভাবেই হোক নিয়ে আসবেন। আমি ওকে সব বুঝিয়ে বলবো। অবহেলা নয় ভালোবাসা দিয়ে মানসিক রোগ কে জয় করা যায়।
আমি দেখলাম ভদ্র মহিলার চোখ দুটো খুশিতে চকচক করে উঠছে। তিনি যেনো আমার কথায় আশার আলো দেখতে পেলেন।
"আমার যাদু পাগল না, আমার যাদু পাগল না। কে বলে আমার যাদু পাগল। কে বলে। স্যার, দেখেন দেখেন কি সুন্দর চাঁদের মতো দেখতে আমার ছেলে। আপনিই বলেন, আমার যাদুর মতো দেখতে সুন্দর এ রকম একটা চাঁদের টুকরো ছেলে ক'টা পাবেন এশহরে...। বলেন, বলেন...। আর ওই পাঁজি মেয়েটা বলে, আমার ছেলে নাকি পাগল। বজ্জাৎ একটা মেয়ে..."
হন হন করে আমার চেম্বারে ঢুকে কথা গুলো বলছেন মহিলা। আমি বললাম, বসুন বসুন, কি হয়েছে?
তিনি বসলেন ছেলেকেও পাশের চেয়ারে বসালেন, কিন্তু কথা বন্ধ করলেন না। বলতেই থাকলেন....
"....বিয়ের সময়তো নিজেরা সবাই উতলা হয়ে গিয়ে বিয়ে করছিলে আমার যাদুরে। আমি কি তোমাদের কাছে যেচে গিয়ে বলে ছিলাম, আমার চাঁদের টুকরো'র মতো একটা ছেলে আছে। তার সাথেই তোমাদের মেয়েটিকে মানাবে। তোমরাই না গুস্টি শুদ্ধ সব আমার হাতে পায়ে ধরলে, আমার ছেলে কে জামাই করবে বলে।
'আহা কি সুন্দর ছেলে, কি ভদ্র ছেলে। ওমন সুন্দর, নম্র, ভদ্র, চরিত্রবান ছেলে কালে ভদ্রে চোখে লাগে।... এখন কার ছেলেগুলো কি মিছকে শয়তান। কাজ কাম নাই, একশোটা মেয়ের পিছনে কেবল ঘুর ঘুর করে। দোহাই বেয়াই সাহেবা, আর না কইরেন না। এই ছেলে কে আমাদের মেয়ের সাথে খুব মানাবে। বেয়াই সাহেবা দোহাই আর না কইরেন না...মনে নেই মনে নেই সেসব...,তবে এখন কেনো পাগল বলছো আমার ছেলেকে..,কি করেছে আমার ছেলে"
আমি বললাম,
কি হয়েছে, চাচী। প্লিজ একটু বসুন শান্ত হন,আমি দেখছি।
"...না না আমি শান্ত হবোনা। ওরা কি পেয়েছে। আমি কত্ত করে বললাম, না না না। লাগবেনা আমার ওমন লন্ডনী বিদেশী মেয়ে মেয়ে, আমি আমার ছেলেকে কোন বিদেশী মেয়ের সাথে বিয়ে দিবোনা। আমি আমার ছেলেকে হারাতে চাইনা...। কিন্তু..., কিন্তু তোমরাই তো সব একেবারে হাতে পায়ে ধরে মিনতি করে বিয়ের জন্যে উতলা হলে। তোমাদের মেয়ে নাকি মানছেই না। নাওয়া খাওয়া বন্ধ করেছে। একেবারে লাইলী হয়ে গেছে। হাহ...! লাইলী। কোথায় গেলো লাইলী গীরি। আর এখন বলে কিনা, "ছেলে পাগল"। কেনো বাবা, বনি বনা হয়না চলে যাও, ডিভোর্স দিয়ে চলে যাও। অসুবিধা নেই। আমার কলিজার টুকরো এরকম রাজপুত্রের জন্যে ওমন মেয়ের অভাব হবেনা। মিছে মিছি অপবাদ দিচ্ছো কেনো, পাগল বলছো কেনো? আল্লাহর গজব পড়বে তোমাদের উপর..,
...আয় বাবা, আয় আমার কোলে আয়। কে বলেছে তুই পাগল। এই দ্যাখ, ডাক্তারের কাছে তোকে নিয়ে এসেছি। ডাক্তার সাহেবই বলবে, তুই পাগল কিনা..."। মহিলা এবার ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলেন ছেলের মাথাটাকে কোলে রেখে।
আমি তাকে আবারো শান্ত হতে বললাম,
"..প্লিজ চাচী, বসুন। আমি দেখছি। কে বলেছে আপনার ছেলে পাগল। সত্যিতো কত্ত সুন্দর ছেলে আপনার। এরকম সুন্দর ছেলে আমি খুব কম দেখেছি। আপনি বসুন। আপনার ছেলে পাগল নয়, ও ভালো। ও সুস্থ। কোন হতচ্ছাড়ার এমন স্পর্ধা যে, এমন চাঁদের টুকরো ছেলেকে পাগল বলে। আপনি বসুন, প্লিজ..."।
মহিলা এবার থামলেন। বসে বসে নিরবে চোখের জ্বল মুছতে লাগলেন।
ভদ্র মহিলার বয়স পঞ্চাশ এর কাছা কাছি। মাথায় কাপড় দেয়া। সাদা কালো চুল গুলো কপাল ঢেকে রেখেছে আধটা। দেখতে তাকে বেশ সম্ভ্রান্ত, বনেদী ঘরের লাগছে। তিনি ছেলেকে নিয়ে এসেছেন আমার চেম্বারে। গেলো কদিন থেকে ছেলেটি নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। চুপচাপ হয়ে গেছে। কিছু উল্টো পালটা আচরন করছে।আগে থেকে কিছু ওষুধ খাচ্ছিলো, সেগুলো ও এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটা তাকে না জানিয়ে করা হয়েছে । ওষুধ বন্ধ করার বিষয়টি তিনি জানতেন না। আসার সময় বউই বলেছে,
"মা আমি আর পারবোনা আপনাদের ছেলে কে নিয়ে থাকতে। আপনার ছেলে একটা পাগল। বিয়ের পর থেকেই তিনি কিসব উল্টোপাল্টা করছেন। কথা বলেন না। চুপ হয়ে গেছেন। একে বারেই চুপ। কথা দুএকটা যাও বলছেন সেগুলো একেবারে অসংলগ্ন, বাস্তবের সাথে মিল নেই। রাতে আবার ঘর থেকে বেরিয়ে যান। বেরিয়ে গিয়ে কবরের পাশে বসে থাকেন। নতুন বউ ঘরে রেখে জামাই বের হয়ে গিয়ে কবরে বসে থাকেন, এটা কোথাও শুনেছেন। আমি আর পারবোনা এসব। পারবোনা পাগলের সংসার করতে, আর নিয়ম ধরে রোজ রোজ ওষুধ খাওয়াতে।
চাচী ছেলে কি নতুন বিয়ে করিয়েছেন...?
"...হ্যা, বাবা। গত মাসেই ধুমধাম করে ছেলের বিয়ে হয়েছে। আমি রাজী ছিলাম না। কিন্তু সবার অনুরোধ, চাপাচাপি তে শেষতক রাজী হই। বিয়ের আগ পর্যন্ত ও ভালো ছিলো। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই আবার হঠাৎ কি হতে কি হয়ে গেলা। সব একেবারে উলট পালট..।
ছেলেটি আমার সামনে বসে রইলো চুপচাপ । কোন কথা বলছেনা। বয়স আনুমানিক বাইশ কি তাইশ হবে। বেশ লম্বা, ধবধবে ফর্সা, সুঠাম দেহী। মনে হয় জিম টিম করে নিয়মিত । বাশির মতো খাড়া নাক, ঠোট গুলো ঈশৎ গোলাপি, চিকন ভ্রু। বিস্তৃত কপাল। কুচকুচে কালো কোকড়ানো চুল, চুলগুলো চমৎকার পরিপাটী করে আঁচড়ানো। এরকম সুন্দর ছেলে খুব কম দেখা যায়। অনেকটা ফিলিস্তিন বা কাশ্মীর অঞ্চলের যুবক দের মতো। মায়ের সাথে তার চেহারা আর গড়নের অসম্ভব মিল। মনে হচ্ছে বিধাতা মায়ের এনে মুখটাকেই বসিয়ে দিয়েছেন ।
মাকে জিজ্ঞেস করলাম,
কি ব্যাপার চাচী। আপনার ছেলে আর ছেলের নতুন বউ ঝগড়া করছে বুঝি...?
".... ঝগড়া কিনা জানিনা বাবা, কাল বউ আমার চাঁদের টুকরা, আমার কইলজা ছেড়া বুকের ধন, একমাত্র ছেলেকে পাগল বলেছে। আমার ছেলে নাকি পাগল। কি বলবো...! এমন অপবাদে মনে হচ্ছে কে যেনো আমার কইলজাটা'তে একটা পেরেক ঢুকিয়ে দিয়েছে....."
আমি বললাম,
চাচী বাদ দেন ওসব, ছেলের দিকে তাকিয়ে বললাম, কি নাম বাপু তোমার । কি হয়েছে ..?
সে চুপচাপ বসে আছে। এদিক ওদিক দিকে তাকাচ্ছে। বড় বড় সুন্দর ডাগর চোখ। কেবল সুন্দর ডাগর বললে কম হবে। অপূর্ব তার চাহনী। এ বয়সি হাজার খানেক ছেলেকে সারি বদ্ধ ভাবে দাড় করিয়ে রাখলে কেবল তার সুন্দর চোখ, ভ্রু জুগল, আর দেহৈক গড়ন দেখে এক নিমিষেই তাকে আলাদা করা যাবে । তার উপর একেবারে ফর্সা। ফর্সা ও না। গোলাপি আভা ছড়ানো ফর্সা। ফর্সা মানুষ দের চামড়ায় মেলানিন কম থাকে, চামড়ার নীচে আঁকাবাঁকা লতার মতো নীলাভ রক্ত নালী গুলো ভেসে থাকে। এরকম মানুষ কে দেখতে আবার অনেক সময় ঈশৎ গোলাপিও লাগে। এছাড়া রাগলে বা অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে মুখে রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যায়। সেজন্যে তাদের অনেক সময় টকটকে লাল আপেলের মতো দেখায়। ছেলেটির ও ঠিক এরকম।
"এঞ্জেল ম্যান সিন্ড্রোম" বলে ব্রেনের একটা রোগ আছে। বেবী টি দেখতে এতো সুন্দর হয়, মনে হয় যেনো সৃষ্টি কর্তা নিজ হাতে গড়ে স্বর্গ থেকে এই মাত্র পাঠিয়েছেন। এঞ্জেল ম্যান সিন্ড্রোম এর রোগী দেখতে এঞ্জেল এর মতো সুন্দর বলেই রোগটির নাম দেয়া হয়েছে এঞ্জেল ম্যান সিন্ড্রম। অথচ অবাক করার বিষয়, রোগ বলতে তার মধ্যে অটিজমের কিছু ফিচার থাকে। এ ছেলেটিকে দেখেই আমার এঞ্জেল ম্যান সিন্ড্রোম রোগের কথা মনে পড়লো। এতো সুন্দর ছেলে কিন্তু তার মাঝে আল্লাহ তায়লা হঠাৎ কি এক রহস্যময় রোগ দিয়ে দিয়েছেন যে সদ্য বিয়ে করা বউ অধৈর্য হয়ে বলেছে, "এ ছেলে পাগল"। যদিও এভাবে বলাটা তার ঠিক হয়নি। ছেলেটির মা'তো এটা একেবারে মানতেই পারছেনা। ছেলের মা কেনো, একে দেখে আমারও সন্দেহ হচ্ছে এর আবার কি মানসিক সমস্যা হবে। এঞ্জেল এর মত দেখতে ছেলেটি , অথচ তার মনে আল্লাহ এমন রোগ দেখা দিয়েছেন যে,তার বউ বলেছে সে চলে যাবে।
যাক গে, নির্মম সত্য হলো মানসিক রোগী দের এক সময় সবাই এক এক করে ছেড়ে চলে যায়। কেবল মাত্র "মা" ছাড়া। একমাত্র মা ই তার ছেলে বা মেয়েকে ছেড়ে যান না, সে যত বড় অসুখ ই হোক না কেনো। মা'রা খুব ধৈর্য ধরে আজীবন আগলে রাখেন মানসিক রোগাগ্রস্ত সন্তানটি কে। এক বুক আশা নিয়ে স্বপ্ন দেখেন, একদিন হয়তো সে সুস্থ হয়ে যাবে। ভেংগে পড়েন না কখনো।
কিন্তু এই ছেলেটির মা বেশ ভেংগে পড়েছেন। ছেলেকে পাগল বলায় ভিষন রি-একশন হয়েছে তার মধ্যে। এটা তিনি কোন ভাবেই মানতে পারছেন না। এতে তিনি খুব কস্ট পেয়েছেন। কস্ট পাওয়ারই কথা। এতো সুন্দর একটা ছেলেকে পাগল বললে, মা কেনো যে কারোর ই খারাপ লাগবে। তাছাড়া মানসিক রোগী কে পাগল বলাটাও তো ঠিক না। এটা এক ধরনের অন্যায়, মূর্খতা, জঘন্য অপরাধ যা আমাদের সমাজে চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।
আমি বুঝলাম ভদ্র মহিলার এমন রিএকশন এর ও হয়তোবা কোন কারন আছে। কেননা অনেক মায়েরাই তো মানসিক রোগাগ্রস্ত ছেলে বা মেয়ে নিয়ে নিয়োমিতো আসছেন চেম্বারে। কিন্তু উনার মতো আর রি একশন করেন নি বা করছেন না কেউ কখনো।
যাক ছেলেটি এখনো চুপ চাপ আমার সামনে বসে আছে। আমার প্রশ্নের কোন জবাবই দিচ্ছেনা। কেবল বড় বড় চোখ দিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। চুপ থাকায় শেষতক মা'ই বললেন,
"...বাপরে ,আমার যাদু। কথা বলো বাপ। স্যার তোমাকে জিজ্ঞেস করছেন তোমার নাম। বলো বাপ। তোমার নাম বলো", মায়ের গলাটা ধরে আসলো।
ছেলেটি মায়ের দিকে তাকায়। মা ঈশারা করেন,
"নাম... নাম। নাম বলতে বলেছেন যাদু, ভয় নাই..। বলো বলো তোমার নাম..।
ছেলে আস্তে করে বললো,
নাম..? মায়ের মুখ খুশিতে চক চক করে উঠলো, তিনি বললেন,
...হ্যা যাদু তোমার নামটি বলো!
নাম...? আমার নাম , আমার নাম....হুম..., মা আমার নাম টা কি। আমি ভুলে গেছি মা। তুমি বলে দাও..।
...যাদুরে যাদু। কি হলো তোর। তোর নাম "কিরণ"। বল, "কিরণ আমার নাম"। মা বললেন।
তাই...। হ্যা..., মনে হয় আমার নাম কিরণ। মা তুমি কাঁদো কেনো..।
আমি বললাম, কিরণ তোমার নাম? গুড , কিরণ বলো কি তোমার সমস্যা?
আমার...?..কই, আমার কিছু হয়নিতো..।এই বললে কিরণ এবার চেয়ার ছেড়ে উটে চলে যেতে চাইলো। তার মা ই দপ করে তার হাতে ধরে আবার বসিয়ে দিলেন।
"যাসনে বাপ আমার, যাসনে। বস। স্যার তোকে ভালো করে দিবেন। তুই বস..."।
কিরণ আবার আমার সামনে বসে। আমি আপাদমস্তক দেখলাম। জিন্সের প্যান্ট, সাদা টি শার্ট, ক্যাটস। ড্যাম স্মার্ট বলা যায়। কিন্তু ব্যাপার টা কি। আমি মেলাতে পারলাম না কিছু। আমি কিরণের মাকে বললাম,
চাচী কিরণ তো কিছু বলছে না, আমি আপনার সাথে একটু বিস্তারিত কথা বলতে চাই...
জ্বি বাবা বলেন, আপনিও আমার ছেলের মতো। বলেন কি জানতে চান...?
আমাকে কি একটু খুলে বলবেন সব। আপনার আর আপনার ছেলের ব্যাপারে...।
"...বাবা কি বলবো। যাদুটা আমার একমাত্র ছেলে। চোখের মনি। দেখছেন কি সুন্দর চাঁদের একটা টুকরা। সবকিছুই তো ভালো চলে যাচ্ছিল। কেবল বছর দুয়েক আগে একবার তার হঠাৎ একটা সমস্যা হয়। সেবার দোকান থেকে এসেই সে বললো,
"...মাগো, ইদানিং আমি শব্দ শুনি। আলগা শব্দ। কেউ না থাকলেও শুনি। আমার কানে কানে কে যেনো কথা বলে। অনবরত কথা বলে...
আমি বললাম,
".. কি কও যাদু। কে কথা কয় তোমার সাথে"
সে বললো,
"....না মা আমি জানিনা। কিন্তু কথা শুনি মা। আলগা কথা।মাঝে মাঝে ভয় ও হয় মা।
ধীরে ধীরে তার সমস্যা আরো বাড়তে থাকে। সে ঘরে একা থাকা শুরু করে। একা একা কথা বলতে শুরু করলো। ঘর থেকে বাইরে বের হওয়া বন্ধ করে দেয়। তার দুটো ব্যবসা আর অনেক গুলো দোকান ছিলো। বেশ ভালো ব্যবসা করতে পারতো সে। ব্যবসা গুলো সবই তার নিজের হাতে গড়া। ধীরে ধীরে ব্যবসা গুলো সে অন্যের কাছে দিয়ে দিতে থাকে। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। সব কিছু কেমন যেনো উলট পালট হতে লাগলো আমার কাছে। ভাবলাম চাঁদের টুকরোর মতো আমার ছেলেকে হয়তো নজর টজর দিয়ে কেউ যাদু টোনা করেছে। কিংবা পরী টরী আছর করেছে।
আমি বিভিন্ন পীর, মাজারে গেলাম ছেলেকে নিয়ে। অনেক মোল্লা মুনসি দেখালাম। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। সমস্যা আরো বাড়তে থাকে। এমন সময় এক মৌলভী বলেন, আপনার ছেলেকে ব্রেইনের ডাক্তার দেখান। মনে হয় ওর ব্রেনে কিছু সমস্যা হচ্ছে। যাদু টোনা পরী এসব কিছুনা...।
আমার অনুরোধে হুজুর একটা তাবীজ দিলেন। পানি পড়া দিলেন বটে। কিন্তু বার বার একটা কথা বললেন, "ব্রেনের ডাক্তারের কাছে যান.."।
আমি পরে একজন ব্রেনের ডাক্তারের কাছে যাই। তিনি সব দেখে টেখে বলেন, ওর ব্রেনে কিছু সমস্যা হয়েছে। তবে সমস্যা টা আগে থেকেই নাকি ছিলো। প্রকাশ হয়নি। অনেক যত্ন, আদর, সোহাগ আর ভালোবাসার মধ্যে ছিলো, তাই তা কখনোই প্রকাশ হয়নি।
ডাক্তার সাহেব আমাকে বুঝালেন, একের পর এক ব্যবসা, বানিজ্য, দোকান এসব করতে যেয়ে তার মন আর শরীরের উপর দিয়ে অনেক ধকল আর পরিশ্রম যাচ্ছিলো। বেশ অঘুমা আর টেনশন ও তাকে পেয়ে বসছিলো। তাছাড়া কিছু মেয়েও নাকি তাকে রাত বিরাত ফোন দিয়ে ডিস্টার্ব করছিলো। উল্টো পালটা কথা বলছিলো। ভয় দেখাচ্ছিলো। এজন্যে সে ঘুমাতে পারতোনা। যেটা সে ডাক্তারের কাছে খুলে বলে। এসব স্ট্রেস তার মনের উপর খুব প্রভাব করেছে। তাছাড়া যেহেতু তার রক্তের (জ্বিনের) মধ্যে মানসিক রোগ টা ছিলো, তাই হঠাৎ একসাথে এতগুলো স্ট্রেসে কে একসাথে সে মানিয়ে নিতে পারেনি। সেজন্যে নাকি রোগটা প্রকাশ প্রকাশ পেতে শুরু করছিলো।
অনেক ভালো ডাক্তার ছিলেন। আমাকে তিনি খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে বলেছিলেন। দু তিন বার তার কাছে যাই ছেলেকে নিয়ে। তিনি প্রতিবার সময় নিয়ে তার সাথে কথা বলতেন, গল্প করতেন।কিছু ওষুধ দেন। এতে তার ঘুম বাড়ে। সে সেরে যেতে থাকে।
তিনি আরোও বলেন,সে যেনো পরিমিতো ঘুমায়। বিশ্রাম নেয়। কোন স্ট্রেস যাতে না নেয়।
ডাক্তার স্যারের ওষুধ আর উপদেশে সে এক সময় ভালো হয়ে যায়। তার কানে কানে আর আর কোন গায়েবি বা আলগা শব্দ আসেনা। তার ভয় ও কমে যায়। আবার সে ব্যবসা বানিজ্যে চলে যায়। তবে তিনি একটি ওষুধ চালিয়ে যেতে বলেন। এবং বলেন, তার নির্দেশ ছাড়া যেনো বন্ধ না। আমি তাই করেও যাচ্ছিলাম। রোজ সকালে নাস্তার পর একটা ট্যাবলেট তাকে খাওয়াতাম। এক দিন ও বাদ হয়নি।
এখনকার এই সমস্যা দেখা দিয়েছে গত মাসে ছেলের বিয়ের পর থেকে। বিয়েতে আমি রাজী ছিলাম না। কিন্তু কোত্থেকে এসে এক লন্ডনী মেয়ে আমার ছেলেকে দেখে একেবারে দেওয়ানা হয়ে যায়। আসলে মেয়েটি স্বপরিবারে দেশে আসে তার বিয়ের উদ্দ্যেশে। তারা ছেলে খুজতে থাকে। সুন্দর, সুঠাম, সৎচরিত্রবান ছেলে। হঠাৎ তারা একদিন আমার ছেলের দোকানে আসে কেনাকাটা করতে। ওখানেই মেয়েটি আমার ছেলের সাথে পরিচিতো হয়। কেনা কাটা করে যাবার সময় দোকানে মেয়েটি ভুল ক্রমে তার মোবাইল ফেলে যায়। আমার যাদু তাদের ফোন দিয়ে সেটা ফেরত নিতে বলে। পরের দিন মেয়েটি ফোন নিতে আসে, সেই থেকে পরিচয়। আমার ছেলেকে দেখে ভালোলাগে মেয়েটির। সে তার মা বাবা এটা খুলে বলে। তাদেরও ভালো লাগে। ভালো লাগার ই কথা। আপনিই তো দেখছেন আমার যাদু কে।
ওরা সবাই আলাপ নিয়ে আমার বাসায় আসতে থাকে। আমি রাজী হইনা। আমি তাদের বললাম, আমার ছেলে এখন বিয়ে করবেনা। আরো বললাম আমার ছেলের ব্রেনে একটু সমস্যা আছে। তারা বিশ্বাস করলননা। জিগ্যেস করলেন কি সমস্যা। আমি বললাম সব। কিন্তু তারা তাও বিশ্বাস করলেন না। হেসে উড়িয়ে দিলেন।
তারা বললেন, এগূলো টুকটাক সুন্দর ছেলে দের থাকলে, আর প্রেমে টেমে পড়লে বা বিয়ের ভুত মাথায় চাপ চাপলে তা বেড়ে যায়। আমি ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেখাই। তারা বললো কোন অসুবিধা নেই, বেয়াই সাহেবা। আমরা সব দায়িত্ব নিলাম। যদি কোন সমস্যা হয় আমরা লন্ডনে ওকে সিকিয়াট্রিস্ট দেখিয়ে চিকিৎসা করাবো। আপনি শুধু হ্যা বলেন। আপনার চাঁদের টুকরো কে আমাদের চাই ই চাই।
আমার মন তাদের কথায় সায় দেয়না। তারাও আমার পিছু ছাড়েনা। তাছাড়া আমিও চাইছিলাম না কোন বিদেশি মেয়েকে আমার ঘরের বউ করবো। কারন আমার কইলজার টুকরা একটা। একটাই যক্ষের ধন। ওই আমার জীবন, ওই আমার মরন। ওর জন্যই আমি বেঁচে ছিলাম। না হলে কবি আমি আত্মহত্যা করতাম। তাদের কথায় আমি ছেলেকে ডেকে এক রাতে জিজ্ঞেস করলাম বাবা,
তুই বল। তুই যদি বলিস মেয়েটিকে তোর পছন্দ তাহলে আমি আর না করবো না। তোর সুখ ই আমার সুখ। আমার ছেলে একটু সাদাসিধা। লাজুক। ও কিছু বলেনা। আমি ভাবলাম মনে হয় সেও রাজী...। তিনি থামলেন।
তারপর..
আমার একটাই কইলজার টুকরা। তার বাবা নাই। ও যখন ছ'মাসে গর্ভে তখন এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাবা..... ।
সড়ক দুর্ঘটনা? মানে চাচী বুঝলাম না। কি ব্যাপার একটু খুলে বলবেন...
বাবা থাক এসব দুখের কাহিনী। যা গেছে তা টেনে আর কি হবে।
তারপরও যদি একটু বলতেন চাচী। মানসিক রোগের চিকিৎসা করতে গেলে অনেক সময় রোগীর সম্পর্কে যেমন জানতে হয় তেমনি তার ফ্যামেলী সম্পর্কেও টুকটাক জানতে হয়। আপনি খুলে বললে আমার জন্যে ভালো হয়।
আহ...বলে মহিলা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন...
তার পর শুরু করলেন।
খুব অল্প বয়সে বাবা আমার বিয়ে হয়। আঠারো কি উনিষ। আসলে বাবা কি বলবো, আমি নাকি ছোট বেলা থেকেই দেখতে খুব সুন্দর ছিলাম। আমাকে সবাই "ইরানী" মেয়ে বলতো। রাস্তা দিয়ে হাটতে গেলে সব সহ পাঠিরা বলতো ঐ যে ইরানী যায়। আমাকে নিয়ে আমার মা বাবা সবার খুব অসুবিধা পোহাতে হচ্ছিলো। প্রতিদিন ঘঠক আলাপ নিয়ে আসতো। সকালে এক ঘঠক তো বিকালে এক ঘঠক। ঘঠকে ঘঠকে মারামারি, হাতাহাতি। কতো আর এসব ঝামেলা সহ্য হয় ।
একদিন বাবাই বললেন, ঠিক আছে কি আর করা। আল্লাহ যখন দিয়ে দিয়েছেন সুন্দর মেয়ে, রাস্থায় বের হলেই তো সবার নজরে পড়বেই। আর মেয়ে হয়েছে যেহেতু,পরের ঘরে একদিন যেতেই হবে, দুদিন আগে না হয় দুদিন পরে। তাইলে কি দরকার এতো ঝক্কি ঝামেলার। দেখেশুনে দিয়েই দেই বিয়ে। অনেক সময় সুন্দর ই মানুষের জীবনে কাল হয়ে যায়। দিন কাল খারাপ, কিনা কি হয়।
আমার বিয়ে হয়ে যায়। ওর বাবা আমাদের আত্মীয়ের মধ্যেই ছিলেন। খুব ভালো মানুষ। উনিও আমার মতো লম্বা চওড়া আর ফর্সা ছিলেন। আমরা যখন দুজন রাস্তা দিয়ে হেটে যেতাম তখন সবাই হা করে তাকিয়ে থাকতো। বলতো ঐ ইরানের বাদশাহ আর বেগম হেটে যায়। আমাদের সুখে সংসার কেটে সুন্দর ছিমছাম। বছর দুয়েকের মাথায়
একদিন আমি বাথরুমে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যাই। কিরণ তখন ছয় মাসে গর্ভে। আমার স্বামী ছিলেন বাজারে। তিনি খবর পেয়েই হোন্ডা নিয়ে রওয়ানা হন। কিন্তু পথিমধ্যে..।
ভদ্র মহিলা থেমে যান। তার চোখ জ্বলে ভিজে যাচ্ছে। পাশে বসা ছেলেটি মায়ের চোখের জ্বল মুছে দিচ্ছিলো। ও বললো, মা কাঁদছো কেনো। দেখলাম মায়ের কান্না দেখে ছেলেটির চোখের কোনে পানি জমছে শিশিরের কনার মতো।
ভদ্র মহিলা কে জিজ্ঞেস করলাম তার পর কি হলো?
আমি মাথা ঘুরে বাথরুমে পড়ে অজ্ঞান, এটা শুনে তিনি তাড়াহুড়ো করে আসতে যেয়ে পথিমধ্যে এক্সিডেন্ট করেন। একটা ট্রাক তাকে চাপা দেয়। তিন দিন অজ্ঞান থাকার পর তিনি সিলেট ওসমানী মেডেকেলে মারা যান...।
মহিলা এবার আর কোন কথা বলতে পারছেন না। তার ঠোট গুলো বোবা কান্নায় কঁপছিলো।
তারপর বলুন চাচী , কি হলো..?
তারপর কি হবে। আমি ভাগ্য কে মেনে নিলাম। সবই আল্লাহর পরীক্ষা। কদিন পর কোল জোড়ে আসে আমার এই যাদু। যাদু আমার এতো সুন্দর ছিলো যে বলার মতো না। যেনো এক টুকরো চাঁদ। একেবারে বাপের মতন। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি সব ভুলে যাই।
আমি সিদ্ধান্ত নেই আর বিয়ে করবো না। এমন চাঁদের টুকরোকে রেখে আমি কোথাও যাবোনা। আমাকে অনেক চেষ্টা করেন আমার বাবা আবার বিয়ে দেবার জন্যে। আমার জন্যে আবারো অনেক আলাপ আসতে থাকে। আবারো বেড়ে যায় ঘটকের আনাগোনা। আসলে আমি খুব সুন্দর ছিলাম। কিন্তু আমি বাবাকে বলি, বাবা আমার এই কলিজার টুকরো কে ছেড়ে কোথাও যাবোনা। লাগবেনা আমার আর বিয়ে।
আমি আর বিয়ে করিনি। কিরন কে নিয়েই আমি পড়ে থাকি। ও বড় হয় ধিরে ধীরে। আমার সব কস্ট ওকে দেখলেই মুছে যেতো। মাঝেমধ্যে ও একটু কান্না কাটি করতো, বাবা কই বাবা কই। সবারতো বাবা আছে আমার বাবা নেই কেনো। আমি তখন অকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতাম। ওর বাবার কবর দেখিয়ে বলতাম, ঐ খানে তোর বাবা শুয়ে আছে। পরকালে আমরা যখন আল্লাহর বাড়ী যাবো তকন তোর বাবার সাথে আমাদের দেখা হবে। তখন তোকে তিনি কোলে নিয়ে আদর করবেন। সে বলতো, মা চলো তাইলে আজই আল্লাহর বাড়ী
যাই। বাবাকে দেখে আসি, এই বলে বলে সে কোলেই ঘুমিয়ে পড়তো...।
আচ্ছা বাবা সত্যি কি আমার ছেলে পাগল। কেনো সবাই আমার এমন সোনার টুকরো কে পাগল বলে। আমার কলজে যে ছিড়ে যায়। এই শোনার জন্যে কি আমি বাইশটি বছর সব সাধ আহ্লাদ জলাঞ্জলি দিয়ে তিল তিল করে ছেলে কে বড় করলাম। কি দোষ আমি করলাম বাবা, কি দোষ...। তিনি অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন
আমি কিছুটা ইমোশনাল হয়ে গেয়েছিলাম। আসলে প্রতিটি ঘোরতর মানসিক রোগীদের ই এরকম কোননা কোন দুখঃজনক ইতিহাস থাকে। আমাদের স্যার অধ্যাপক গোপাল শংকর দে বলতেন, "ট্রাই টো দা এন্টার অব দি মাইন্ড", " এভরি হিসট্রি অব পেশেন্ট আর ভেরী মাচ প্যাথেটিক"।
আমি নিজেকে সামলে বললাম,
চাচী, আপনার ছেলে পাগল না। ওরা সব মুর্খ। ঘাবড়ানোর কিছু নেই।আপনার ছেলের মনের মধ্যে ছোট একটি অসুখ। এটা একটা মানসিক রোগ। আপনি ওষুধ খাওয়ান, ও ভালো থাকবে। ডায়াবেটিস, প্রেসার এগুলোতোও রোগ। এগুলো কি ভালো হয়? হয় না। এগূলো কে ওষুধ খেয়ে খেয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। মানসিক রোগ গুলোও ঠিক এমন। একে নিয়ন্ত্রনে রেখে সবই করা সম্ভব। আপনার ছেলের মানসিক রোগটাও আপনি যত্ন করে ওষুধ খাইয়ে খাইয়ে এতোদিন নিয়ন্ত্রনে রেখেছেন। কিন্তু বিয়ের সময় আপনাদের বেখেয়ালে বড় ভুল হয়ে যায়। ওর ওষুধ গুলো আপনারা কয়েকদিন বন্ধ রেখেছেন। যেটা তার ডাক্তার উপদেশ দিয়ে ছিলেন কবছর আগে। তাই তার মানসিক রোগের লক্ষন গুলো কিছুটা ফিরে এসেছে। আপনি চিন্তা করবেন না। ও ঠিক হয়ে যাবে আগের মতো। আবার সে ব্যবসা বানিজ্য করবে। আর ওর স্ত্রী কে যেভাবেই হোক নিয়ে আসবেন। আমি ওকে সব বুঝিয়ে বলবো। অবহেলা নয় ভালোবাসা দিয়ে মানসিক রোগ কে জয় করা যায়।
আমি দেখলাম ভদ্র মহিলার চোখ দুটো খুশিতে চকচক করে উঠছে। তিনি যেনো আমার কথায় আশার আলো দেখতে পেলেন।
লেখক: ডা. সাঈদ এনাম ।
এম.বি.বি.এস (ডি এম সি) এম ফিল (সাইকিয়াট্রি) সাইকিয়াট্রিস্ট ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, সিলেট।

