মৌলভীবাজারে দুশ্চিন্তায় কমলাচাষীরা!

মৌলভীবাজারে দুশ্চিন্তায় কমলাচাষীরা!

মৌলভীবাজার প্রতিনিধিঃ পাহাড়ি টিলায় সম্ভাবনাময়ী ফসল কমলা। সুমিষ্ট রসের এ ফসলের চাহিদাও সর্বত্রই। লাভজনক হওয়ায় এমন স্বপ্ন প্রত্যাশায় কমলা চাষে আগ্রহী হয়ে ছিলেন স্থানীয়রা। ২০০১ সালে কৃষি বিভাগের পরামর্শে জেলার জুড়ী উপজেলার টিলাগুলোতে সৃজনও করেছিলেন বাগান। চাষিদের ব্যাপক আগ্রহ আর কৃষিবিভাগের সার্বিক তত্ত্বাবধায়নে ওখানে গড়ে ওঠে কমলার রাজত্ব। প্রথম দিকে সৃজিত বাগানগুলোতে বাম্পার ফলন হলেও এখন ভিন্ন দৃশ্য।

গেল ৩-৪ বছর থেকে আশানুরূপ ফলন না হয়ে উল্টো ফলন দেওয়ার উপযুক্ত গাছগুলো মারা যাচ্ছে। ফলে ধীরে ধীরে যেমন কমছে বাগানের আয়তন। তেমনি সংকুচিত হচ্ছে কমলা গাছের পরিধি ও পরিসংখ্যান। এমন অব্যাহত সংকটে হতাশ হচ্ছেন বাগান মালিকরা। এখন কমলা নিয়ে এমন আশা-নিরাশার দোলাচলে চাষিরা। নানা সমস্যা ও সংকটে এখন তাদের এমন দুশ্চিন্তা। প্রত্যাশানুযায়ী ফলন প্রাপ্তির অমিলে সম্ভাবনাময়ী এ ফসলটির চাষাবাদ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। প্রতি বছর যেভাবে একের পর এক কমলা বাগান রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে তাতে এ অঞ্চলে কমলা চাষের ঐতিহ্য ধরে রাখা নিয়ে স্থানীয়রা সন্দিহান।

চাষিরা জানান, এবছর প্রথম দিকে কমলার ফুল ও ফল ভালো আসলেও অতি বৃষ্টি আর পোকামাকড়ের আক্রমণে ভালো ফলন হয়নি। দুয়েকটি বাগান ছাড়া অধিকাংশ বাগানের ফলন আকারে যেমন ছোট হয়েছে তেমনি রংও ভালো হয়নি। আর এ কারণে চাষিরা গত বছরের তুলনায় এবছর দামও পাচ্ছেন কম।

বাগান মালিকরা জানালেন, চোখের সামনে বাগানের একের পর এক গাছ মারা যাচ্ছে। অনেক বাগানের অধিকাংশ গাছ বির্বণ হয়ে ফলন কম দিচ্ছে। গাছ ও ডালপালা শুকিয়ে যাচ্ছে। যা অন্য গাছের মতো ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়া পূর্বলক্ষণ। চাষিরা জানালেন অন্যতম কারণ রোগবালাই আর পোকামাকড়ের আক্রমণ। বিশেষ করে গেল কয়েক বছর থেকে একধরনের পোকার (কমলার গাছগুলোর মূল ও কাণ্ডে সরাসরি) আক্রমণে গাছগুলো আক্রান্ত হয়ে অনেক সৃজিত বাগানই এখন ধ্বংসের দোরগোড়ায়। এই বিশেষ গাছ খেকো পোকা বছরজুড়ে গাছের মারাত্মক ক্ষতি করলেও ফুল ও ফল আসার পর থেকে তাদের আক্রমণের মাত্রা বেড়ে যায়। নানা ধরনের কীটনাশক ছিটিয়েও পাচ্ছেন না কোনো সুফল। একদিকে গান্ধী পোকার আক্রমণে ছোট থেকে আধপাকা পর্যন্ত কমলাগুলো গাছ থেকে ঝরে পড়ছে এবং আকার ও রং আশানুরূপ হচ্ছে না। অপরদিকে বছরজুড়ে কমলা গাছ খেকো পোকার আক্রমণে গাছের পাতার রং বিবর্ণ ও দুর্বল হয়ে প্রতিটি গাছ মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে। জুড়ী উপজেলার অধিকাংশ পাহাড়ি টিলাগুলোয় চাষ হচ্ছে কমলা। এখন চলছে ফসলটির ভর মৌসুম।

কমলা চাষের জন্য বিখ্যাত এই অঞ্চলটি ঘুরে দেখা গেল ভিন্ন দৃশ্য। কয়েকটি গ্রাম ঘুরে পাওয়া যায়নি আশানুরূপ কমলার বাগান। ভর মৌসুমেও কমলা না পাওয়ার কারণ হিসেবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন এবছর অতি বৃষ্টি আর পোকার আক্রমণে ফলন আশানুরূপ হয়নি। আর গান্ধী পোকার আক্রমণে গাছ থেকে আধপাকা কমলাগুলো ঝরে পড়ছে। এ কারণেই চাষিরা মৌসুমের শুরুতেই বিক্রি করে দিয়েছেন কমলা। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে লালছড়ার কনর মিয়ার বাগানে দেখা গেল গাছে গাছে দোল খাচ্ছে পাকা আধাপাকা কমলা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন, এ বছর পুরো গ্রামের মধ্যে তার বাগানেই কমলার ফলন তুলনামূলক ভালো হয়েছে। কনর মিয়ার ছেলে জয়নুল আহমদ ও রাসেল আহমদ জানান এবছর আশপাশের বাগানগুলোর তুলনায় তাদের বাগানে ফলন ভালো হয়েছে। তবে পোকার আক্রমণে বাগানের অনেক গাছ ইতিমধ্যেই মারা গেছে আর অধিকাংশ গাছও রোগাক্রান্ত। তারা এবছর বাগানের ফসল একবছরের জন্য বিক্রি করে দিয়েছেন।

ক্রেতা কচুরগুল গ্রামের ইব্রাহীম মিয়ার ছেলে জামাল হোসেন জানান, ব্যবসার জন্য নয় অনেকটা শখের বসে আত্মীয়স্বজন দেশে আসছেন এজন্য এক বছরের জন্য বাগনটির ফসল কিনেছি। বাগান ঘুরে দেখা গেল প্রতিটি গাছে যত্ন করে মশারি দিয়ে জড়ানো। এখনো পাড়া হয়নি কমলা।
তবে জামাল জানান, সবতো নিজেদের জন্য রাখার প্রয়োজন হবে না তাই গতকাল থেকে কিছু বিক্রি করতে শুরু করেছি। তিনি জানান, একসময় এ অঞ্চলের সেরা বাগান ছিল তাদের। কিন্তু পোকার আক্রমণে, গাছগুলোর মরে যাওয়ায় এখন বাগানের অস্তিত্বই নেই।

জেলা কৃষি অফিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জুড়ীর লালছড়া, রুপাছড়া, শুকনাছড়া, হায়াছড়া, কালাছড়া, লাটিছড়া, লাঠিটিলা, বেলাবাড়ী, জুড়ীছড়া, ডুমাবাড়ি, কচুরগুল, উত্তর কচুরগুল, জামকান্দি কমলা চাষের অন্যতম এলাকা। এছাড়া জেলার বড়লেখা ও কুলাউড়াতেও এ ফসল চাষ হচ্ছে কমবেশি। দেশীয় উন্নত প্রজাতির (নাগপুরী) কমলা ওখানে চাষ হয় বেশি। কমলা চাষিদের তথ্য মতে চৈত্র ও বৈশাখ মাসে কমলা গাছে ফল আসে। আর আশ্বিন ও কার্তিক মাসে ফল পাকা শুরু হয়। একটি গাছে ৩০০ থেকে ২০০০ পর্যন্ত কমলা ফল দেয়। কমলা গাছ রোপণের ৩-৪ বছরের মাথায় ফল আসতে শুরু করে। একটি কমলা গাছ রোগবালাইয়ে আক্রান্ত না হলে ২৫-৩০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে এবং ফল দেয়। পাহাড় টিলাবেশষ্টিত এ অঞ্চলের অন্যতম অর্থকরী ফসল এটি। মৌসুমী এই ফসলটি বিক্রি করে পাহাড়ি এ জনপদের লোকজন বছরজুড়ে চালান তাদের জীবনজীবিকা।

চাষিরা জানান, মৌসুমে প্রতিদিনই ওখানকার কমলা পাইকারদের হাত হয়ে যাচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে। তারা জানান, এ বছর কমলার ফলন তেমন ভালো হয়নি। অতি বর্ষণের কারণে কমলার আকার ও রং ভালো হয়নি। তবে দাম অন্য বছরের চাইতে কিছুটা ভালো পাচ্ছেন। এবছর প্রতি হালি কমলা পাইকারি বিক্রি হচ্ছে আকারে ছোট ২০ টাকা, মাঝারি ৪০-৫০ টাকা আর বড় ৬০-৭০ টাকা। মৌসুমে স্থানীয় দিলকুশ, কুচাই, বাংলাবাজার ছাড়াও কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখার স্থানীয় বাজারগুলোতেও প্রতিদিনই কমবেশি খুচরা ও পাইকারি বিক্রি হয়।

চাষিরা জানান. এবছর পোকামাকড়, রোগবালাই আর গান্ধী পোকার আক্রমণে আধাপাকা ও কাঁচা কমলা তারা গাছ থেকে আগাম সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়েছেন। ডাইবেক রোগে আক্রান্ত গাছের কমলা ও গান্ধীপোকার আক্রমণে আক্রান্ত কাঁচা কমলাগুলো শক্ত হয়ে ঝরে পড়ে। এই কমলাগুলোর রং ও কোষা অন্য কমলার চাইতে ভিন্ন হওয়ায় ক্রেতারা তা পছন্দ করেন না। তাই তারা আগাম আধাপাকা ও কাঁচা কমলা গাছ থেকে সংগ্রহ করে বিক্রি করেছেন।

জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দেব দুলাল রায় বলেন, নানা সমস্যা ও সংকটের মধ্যেও এ এলাকায় কমলা চাষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে কৃষি বিভাগ যথেষ্ট আন্তরিক ও বদ্ধপরিকর। চাষিদের পরামর্শ দিতে কোনো কার্পণ্য করছেন না তারা।

Post a Comment

Previous Post Next Post