অনলাইন ডেস্কঃ পুলিশ দম্পতি হত্যায় তাদের মেয়ে ঐশী রহমানকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ থেকে পাঁচ কারণে রেহাই দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত সর্বোচ্চ সাজা কমিয়ে দিয়েছেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, তদন্তকালে তাকে (ঐশী রহমান) কোনো এক ব্যক্তি খারাপ উদ্দেশ্যে কিছু একটা বলেছিল এ কারণে ঐশী আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল।
রায়ে বলা হয়েছে, আসামি ঐশীর বিরুদ্ধে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তার ফাঁসিই উপযুক্ত। কিন্তু বিশেষ কিছু বিষয় বিবেচনা করে তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়।
রোববার প্রকাশিত ঐশীর ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ৭৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসব কারণ জানিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রায়টি প্রকাশ করেন।
সাজা কমানোর বিষয়ে হাইকোর্ট যে পাঁচটি কারণ উল্লেখ করেছেন তা হলো- এক. সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়াই এবং মানসিকভাবে বিপর্যয়ের কারণেই ঐশী রহমান ডাবল হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। সে অ্যাজমা, ওভারি চিস্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত।
দুই. তার (ঐশী রহমান) দাদি ও মামা অনেক আগ থেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। তার পরিবারে মানসিক বিপর্যস্তের ইতিহাস রয়েছে।
তিন. যখন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটানো হয় তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। সে এ ঘটনার সময় সাবালকত্ব পাওয়ার মুহূর্তে ছিল।
চার. তার বিরুদ্ধে অতীতে ফৌজদারি অপরাধের নজির নেই।
পাঁচ. ঘটনার দুই দিন পরই ঐশী স্বেচ্ছায় থানায় আত্মসমর্পণ করে। উদ্ভূত পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তার সাজা কমানো হয়।
রায়ে বলা হয়, মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নয়। এটা কার্যকর করলেই যে সমাজ থেকে অপরাধ দূর হয়ে যাবে তা নয়। কম সাজাও অনেক সময় সমাজ থেকে অপরাধ কমাতে সুস্পষ্টভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বা সাহায্য করে। মৃত্যুদণ্ড রহিত করতে সমাজের প্রতিটি স্তরে সুশাসন ও মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা রোধে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শুধু রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
রায়ে আদালত বলেন, ঐশীর বাবা পুলিশ বাহিনীতে ও মা ডেসটিনিতে চাকরিরত ছিলেন। জীবন-জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ঐশীকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি। তারা যখন উপলব্ধি করছিলেন এ বিষয়টি, ঠিক সে সময় তার জীবন আসক্তিতে উচ্ছন্নে চলে গেছে।
রায়ে বলা হয়, সন্তানদের জন্য বাবা-মা ও অভিভাবকই হলেন প্রাথমিক শিক্ষক। এ হিসেবে তাদের জন্য ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করা ও সন্তানকে সময় দেয়া প্রয়োজন ছিল।
রায়ের ব্যাখ্যায় বলা হয়, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে মৃত্যুদণ্ডকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে মৃত্যুদণ্ড কমানোর কোনো গাইডলাইন নেই। এমনকি তা বিলুপ্ত করার পরিবেশ আসেনি। শিক্ষার হার বেড়েছে। জনসংখ্যাও বেড়েছে। ফলে অপরাধের প্রবণতাও বাড়ছে। এ অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড রহিত করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
গত ৫ জুন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের বেঞ্চ ঐশীর সাজা কমিয়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। নিম্ন আদালত থেকে পাঠানো ডেথ রেফারেন্স ও ঐশীর আপিলের ওপর শুনানি শেষে গত ৭ মে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন হাইকোর্ট। এরপর ৫ জুন রায় ঘোষণা করা হয়।
২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট রাজধানীর চামেলীবাগে নিজেদের বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন ১৭ আগস্ট নিহত মাহফুজুর রহমানের ভাই মশিউর রহমান বাদী হয়ে পল্টন থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই দিনই নিহত দম্পতির মেয়ে ঐশী রহমান পল্টন থানায় আত্মসমর্পণ করে বাবা-মাকে খুন করার কথা স্বীকার করে।
এ মামলায় ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর ঢাকার একটি আদালত ঐশীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করে। হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার দায়ে ঐশীর এক বন্ধু মিজানুর রহমান রনিকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ঐশীর আরেক বন্ধু আসাদুজ্জামান জনিকে খালাস দেয়া হয়।
এ রায়ের কপি ওই বছরের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্টে পৌঁছে। এরপর প্রধান বিচারপতির নির্দেশে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন দ্রুত মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করে। এরপর শুনানির জন্য গত বছর ৩০ নভেম্বর কার্যতালিকায় আসে।
