হাওর থেকে নামেনি বন্যার পানি, বিপাকে মৌলভীবাজারের কৃষকরা

হাওর থেকে নামেনি বন্যার পানি, বিপাকে মৌলভীবাজারের কৃষকরা


অনলাইন ডেস্কঃ ভয়াবহ বন্যার কয়েক মাসের অধিক সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো দুর্ভোগ কাটেনি মৌলভীবাজারের কৃষকদের। গত মার্চ থেকে আগষ্ট পর্যন্ত চতুর্থ দফার বন্যার কবলে পড়ে মৌলভীবাজার। জেলার ছোট-বড় সব হাওর ও বিস্তীর্ন ফসলি জমি প্লাবিত হয় এতে। তলিয়ে যায় বোরো ও আউশ ধান। দুটি ফসল হারিয়ে  আমনে বুক বেঁধেছিলেন হাওরপাড়ের কৃষকরা। তাতেও দুর্ভোগ পিছু ছাড়েনি হাওরপাড়ের বন্যাকবলিত মানুষদের। হাওরে পানি না কমায় আমনের চারা রোপণ করতে পারছেন না জেলার প্রায় পঁচিশ হাজার কৃষক। 

দফায় দফায় বন্যায় বোরো ও আউষ ফসল ঘরে তুলতে না পারলেও আমন নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন কৃষকরা। কিন্তু তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে এখন। দীর্ঘ বন্যায় নষ্ট হয়েছে ধানের বীজতলা, এখনো তলিয়ে আছে আমন চাষের ফসলি জমি। তারপরও জীবিকার তাগিদে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন অনেকে। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ঋনগ্রহন করে আমন চাষে ব্যয় করে এখন তারা দিকভ্রান্ত। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা জায়, চতুর্থ দফার বন্যায় জেলার ১১ হাজার ৬২১ হেক্টরের বোরো ও আউশ ধানের ক্ষতি হয়েছিল। তার মধ্যে ৯ হাজার ৯১৪ হেক্টরের বোরো ও ১ হাজার ৭০৭ হেক্টরের আউশ ধানের ক্ষেত। ক্ষতির তালিকায় রয়েছে জুড়িতে ৪ হাজার ১০ হেক্টরের কুলাউড়া উপজেলার ৩ হাজার ৭৬০, বড়লেখা ২ হাজার ১৪৪ বোরো ধান। ধারনা করা হয়েছিল ২৯ হাজার ৭৪২ মেট্রিকটন চাল উৎপাদন হবে। 

অন্যদিকে সদর উপজেলায় ৬১ হেক্টর, শ্রীমঙ্গলে ১৯ হেক্টর, রাজনগরে ৩৬০ হেক্টর, কমলগঞ্জে ৩০০ হেক্টর, কুলাউড়া ৭৫০ হেক্টর, বড়লেখা ৮২ হেক্টর ও জুড়ি উপজেলার ১৭০ হেক্টরের আউশ ক্ষেত বিনষ্ট হয়। এসব ক্ষেত থেকে প্রায় ৪ হাজার ১৬৫ মেট্রিকটন চাল উৎপাদন আশা করা হয়েছিল। 

এদিকে জেলার বন্যাকবলিত ২২টি ইউনিয়নে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৩৬০ হেক্টর। কিন্তু জমি থেকে এখনো পনি না  নামায় আশানুরুপ চাষাবাদ।  যার জন্য আবাদ হয়েছে মাত্র ৯৫ হাজার ৬০৫ হেক্টর। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪ হাজার ৭৫৫ হেক্টর জমিতে কম আবাদ হয়েছে।

মঙ্গলবার সরেজমিনে সদর উপজেলার একাটুনা ইউনিয়নের কাউয়াদিঘী হাওর পরিদর্শন করে দেখা যায়, বর্তমানে এই এলাকায় প্রায় চার ফুঁট পানি রয়েছে। যার কারণে আমন ধানের চারা রোপণ করতে পারছেন না কৃষকেরা। কৃষকরা জানান, বীজতলায় চারার নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রম করেছে। যথাসময় পানির জন্য চারা রোপন সম্ভব হয়নি। শেষমেশ সাকুল্য হারা ঘরে আমন তুলার আশা ছেড়ে দিয়েছেন তারা।

কৃষক শুক্কুর মিয়া জানান, বন্যায় সব হারিয়ে সর্বশেষ আশা করেছিলাম আমন ধান ঘরে উঠাতে পারলে খেয়ে বাঁচতে পারব। এখন পানির যে অবস্থা আমরা সেই আশা ছেড়ে দিয়েছি। টাকা ঋন করে বীজতলা গঠন করে বীজ রোপন করেছিলাম। তাও নষ্ট হয়ে গেছে। একই বক্তব্য একাটুনা ইউনিয়নের উলুয়াইল, বড়বাড়ি, কানিয়া, বানেশ্রী, মাহতাবপুর, লালাপুর, মানিকনগর, ও বাদে উলুয়াইল গ্রামের কৃষকদের। 

এছাড়া সদর উপজেলার আখাইলকুরা ইউনিয়নের জগৎপুর, কাদিপুর, খইশাউড়া, বান্ধেরগাঁও, এবং রাজনগর উপজেলার মুন্সীবাজার ইউনিয়নের সুপরাকান্দি, পথেরগাঁও,আলীচরগাঁও, সোনাটিকি ও গাজীরবাজার, উত্তরভাগ ইউনিয়নের কালারবাজার ও খেশর পাড়া, ফতেহপুর ইউনিয়নের সোনাপুর, বিলবাড়ী, জাহিদপুর ও আব্দুল্লাহপুর, পাঁচগাঁও ইউনিয়নের সারমপুর, উতাইসারসহ বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে একই অবস্থা দেখা গেছে। বেশিরভাগ জমিতে এখনো ৪-৫ ফুঁট পানি রয়েছে। 

ফতেহপুর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের কৃষক আক্তার উদ্দিন বলেন, এতোটা সময় নষ্ট হয়েছে, দুটি ফসলা হাতছাড়া হয়েছে বন্যার ফলে। এবারো চারা নষ্ট হচ্ছে। 

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, আমনের জমি পানিতে নিমজ্জিত থাকায় অন্তত ১০ হাজার কৃষক আমন চাষাবাদ করতে পারছেন না এবার। বোরো ও আউশ ফসল নষ্ট হওয়ায় যেসব জমিতে পানি আসে না। তার হিসাব অনুযায়ী এবার আমরা লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। কিন্তু আবার পানি এসে আর নামছে না। বিকল্প চিন্তার সময়ও নেই। তাই এবার আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

Post a Comment

Previous Post Next Post