অনলাইন ডেস্কঃ
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের ঘটনার জেরে
গত ১০ দিনে দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। স্থানীয়
লোকজনসহ সরকারি-বেসরকারি সংস্থার তথ্য মতে এই অনুপ্রবেশ এখনো অব্যাহত
রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত এদেশে কত রোহিঙ্গা ঢুকবে তা বলা যাচ্ছে না। কারণ
বানের স্রোতের মতো অবৈধ অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো তাদের প্রতিবেদনে লক্ষাধিক
রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢোকার কথা বললেও বাস্তবে এর সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়েছে
বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে। স্থানীয়দের দাবি ৩ ও ৪ সেপ্টেম্বর দুই দিন
এবং দুই রাতে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে শুরু করে কক্সবাজারের সীমান্ত
উপজেলা উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে ৬০ হাজারের
অধিক রোহিঙ্গা।
যদিও
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর কর্মকর্তা ভিভিয়েন ট্যান বলছেন, এক
রাতের ব্যবধানে রবিবার ৩ সেপ্টেম্বর নতুন করে অন্তত ১৩ হাজার রোহিঙ্গা
বাংলাদেশে ঢুকেছে।
এদিকে,
প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা এসব রোহিঙ্গা প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও মানবিক
সহায়তা পাচ্ছেন না। খাবার ও পানির তীব্র সংকটে খোলা আকাশের নিচে দিনাতিপাত
করছেন। সেই সঙ্গে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত সহিংসতার শিকার হয়ে
বাংলাদেশে পালিয়ে আশা রোহিঙ্গারা আশ্রয়ের খোঁজে পাহাড়-সমতল ও রাস্তা
রাস্তায় রাত কাটাচ্ছেন। অচিন এলাকায় যে যেখানে পারছেন সেখানেই মাথা গোঁজার
ঠাঁই নিচ্ছেন। ফলে উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তের পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে গড়ে উঠছে
হাজারো ঝুপড়ি ঘর।
স্থানীয়দের
সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নতুন করে কয়েক হাজার ঝুপড়ি
ঘর তৈরি করেছে নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা। সেই সঙ্গে প্রতিদিন বানের স্রোতের
মতো রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকছে। যে যেখানে পারছে সেখানেই আশ্রয় নিচ্ছেন।
নাম
প্রকাশ না করার শর্তে সীমান্ত এলাকার এক জনপ্রতিনিধি বলেন, ঈদের দিন
ঘুমধুম সীমান্তে বেশ কয়েকজন মিয়ানমার সেনাদের গুলিতে খুন হওয়ার পরই
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। প্রতিটি সীমান্ত দিয়ে দলে দলে
রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকছে। শিশু-বৃদ্ধদের কোলে-কাঁধে করে নিয়ে আসছে তারা।
যেসব সীমান্তে বিজিবির কড়া অবস্থান রয়েছে সেখানের জিরো পয়েন্টে অবস্থান
করছে রোহিঙ্গা। রাতে কিংবা বৃষ্টিতে যে যার সুযোগ মতো বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে।
গত কয়েকদিনে দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে। এর মধ্যে রবিবার ও
সোমবার ঢুকেছে ৬০ হাজারেরও বেশি।
এদিকে,
সীমান্তের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে গেছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ
সুপার। রোহিঙ্গা হিন্দুদের বর্তমান অবস্থা ঘুরে দেখেছেন বাংলাদেশ হিন্দু
বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত। সীমান্ত এলাকা ঘুরে
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিগত সময়ের চেয়ে এবার রোহিঙ্গা
অনুপ্রবেশ ঘটেছে অনেক বেশি। উখিয়া-টেকনাফ উপজেলার বন বিভাগের জায়গা দখল করে
আরও তিনটি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে। ফলে সীমান্ত এলাকার মানুষের
মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
উখিয়া
উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও উখিয়া উপজেলা আওয়ামী
লীগ নেতা মোজাফর আহাম্মদ বলেন, আমার সীমান্ত দিয়ে কোনো রোহিঙ্গা প্রবেশ
করতে পারেনি। যারা এসেছে ঘুমধুম ও তুমব্রু সীমান্ত বাংলাদেশে ঢুকেছে।
একই
উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী ঢালার বাসিন্দা আবুল কালাম জানান,
রোহিঙ্গারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। নতুন করে দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা
বাংলাদেশে ঢুকেছে। এরা সহায়-সম্বল রেখে প্রাণ বাঁচাতে এদেশে আশ্রয় নিলেও
বাঁচার তাগিতে আগের রোহিঙ্গাদের মতো এরাও অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে
আশঙ্কা করা হচ্ছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের
মুখে গণহত্যা-গণধর্ষণ-নির্যাতন থেকে বাঁচতে গত ১০ দিনে প্রায় এক লাখ
রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক
সংস্থাগুলো। কিন্তু এর সংখ্যা দ্বিগুণ বলে দাবি করেছে স্থানীয় সংস্থাগুলো।
কুতুপালং
ও বালুখালী এবং লেদা রোহিঙ্গা বস্তি নিয়ন্ত্রণকারী মাঝিদের দাবি, তাদের
একেক বস্তিতে নতুন করে ৫০ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। নতুন করে
আরও কয়েকটি বস্তি গড়ে তোলা হয়েছে। সব মিলে নতুন করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া
রোহিঙ্গাদের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ।
কুতুপালং
অনিবন্ধিত ক্যাম্পের আবুল কালাম বলেন, আমাদের ক্যাম্পে গত ২৫ আগস্টের পর
থেকে এ পর্যন্ত অর্ধলাখেরও বেশি নতুন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আশপাশে আশ্রয়
নিয়েছে। বলতে গেলে এর সংখ্যা ৬০-৭০ হাজারের কম নয়। আন্তর্জাতিক
মানবতাবিরোধী ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, এক
লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ঢুকেছে। তবে দুই লাখ হবে কি না তা
এখনো নিশ্চিত নয়। যেভাবে রোহিঙ্গারা স্রোতের মতো বাংলাদেশে ঢুকছে এর
সংখ্যা দ্বিগুণ হতে বেশি সময় লাগবে না বলেও জানান তিনি।
এদিকে
নতুন করে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করার কথা স্বীকার করে জেলা
প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, গত কয়েকদিন আশঙ্কাজনকহারে রোহিঙ্গারা
বাংলাদেশে ঢুকেছে। ঠিক কতসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে তা নিশ্চিত করে
বলা যাচ্ছে না। তবে এর সংখ্যা এক লাখের বেশি। সুত্রঃ ঢাকাটাইমস
