অনলাইন ডেস্কঃ মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জাতি নির্মূল অভিযান চালাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে।
আগুনে
পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের ঘর-বাড়ি। আর নিজেদের সাজানো লোক দিয়ে ঘরবাড়িতে
আগুন দেয়ার ছবি তুলে সেই দায় আবার রোহিঙ্গাদের ঘাড়েই চাপাচ্ছে মিয়ানমার
সরকার।
দেশটির দাবি, রোহিঙ্গারা নিজেরাই তাদের বসতবাড়িতে আগুন দিয়ে সহিংসতা ছড়াচ্ছে। কিন্তু বাস্তবচিত্র বলছে তার উল্টো।
মিয়ানমার
সরকারের ব্যবস্থাপনায় সম্প্রতি সাংবাদিকদের একটি দল রাখাইনে রোহিঙ্গাদের
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নিয়ে যাওয়া হয়। দেশি-বিদেশি ১৮ জন সাংবাদিকের এ দলে
ছিলেন বিবিসির জোনাথন হেড। রাখাইন ঘুরে তিনি নিজের চোখে দেখা অবস্থা নিয়ে
সোমবার একটি প্রতিবেদন লিখেছেন। আর এতে ফুটে উঠেছে কীভাবে রোহিঙ্গাদের
বিরুদ্ধে নিপীড়ন চালাচ্ছে মিয়ানমার ও তার সেনাবাহিনী। তিনি প্রতিবেদনে
জানান, আরাকান রাজ্যের স্থানীয় হিন্দুদের রাখাইন মুসলিমদের মতো পোশাক পরিয়ে
তাদের দিয়ে ঘরবাড়িতে আগুন দেয়া হচ্ছে আর দায় চাপানো হচ্ছে রোহিঙ্গাদের
ওপর।
জোনাথন
আরও লিখেছেন, সম্প্রতি তারা মংডু জেলায় যাওয়ার এক বিরল সুযোগ পেয়েছিলেন। এ
সফরের একটা সমস্যা হলো, আপনি শুধু সেসব জায়গা দেখতে পারবেন, যেখানে
কর্তৃপক্ষ তাদের যেতে দেবে। কিন্তু কখনও কখনও এমন হয় যে, এসব বিধিনিষেধের
মধ্যেও আপনি অনেক কিছু বুঝে নিতে পারবেন।
তিনি
লিখেছেন, রাখাইনের রাজধানী সিত্তে পৌঁছার পর সাংবাদিকদের বলে দেয়া হলো,
কেউ দল ছেড়ে গিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না। সন্ধ্যা ৬টা থেকে
কারফিউ, তাই এরপর ঘুরে বেড়ানো যাবে না। সাংবাদিকরা যেখানে যেখানে যাওয়ার
অনুরোধ জানালেন, নিরাপত্তার কারণে তা প্রত্যাখ্যান করা হল। সিত্তে থেকে
নদীপথে বুথিডং, সেখান থেকে এক ঘণ্টা পাহাড়ি পথ ধরে পৌঁছলাম মংডু। যাওয়ার
পথে পড়ল মাইও থু গি গ্রাম। সেখানে প্রথমবারের মতো পুড়িয়ে দেয়া গ্রাম
দেখলাম- দেখলাম পুড়ে গেছে তালগাছগুলোও।
জোনাথন
আরও লিখেছেন, ‘আমাদের প্রথম নেয়া হল মংডুর একটি স্কুলে, এখানে আশ্রয়
নিয়েছে ঘরবাড়ি হারানো হিন্দু পরিবার। সবাই বলছে একই গল্প- তাদের ওপর
মুসলিমরা আক্রমণ চালিয়েছে এবং তারা ভয়ে পালিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। সেখান
থেকে তোলা ছবিগুলো দেখিয়ে বলা হয়, মুসলিমরা আগুন লাগাচ্ছে। কিন্তু জোনাথন
পরে চিনতে পারেন, এই ছবির নারী একটি হিন্দু গ্রাম থেকে আসা। বিস্ময়কর
ব্যাপার হল, যে হিন্দুরা বাংলাদেশে পালিয়েছে তারা সবাই বলছে, তাদের ওপর
হামলা চালিয়েছে রাখাইন বৌদ্ধরা, কারণ তারা দেখতে রোহিঙ্গাদেরই মতো। ’
জোনাথন
বর্ণনা দেন, এরপর আমাদের নিয়ে যাওয়া হল একটি বৌদ্ধ মন্দিরে। সেখানে একজন
ভিক্ষু বর্ণনা করলেন, কীভাবে মুসলিমরা তাদের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে।
অগ্নিসংযোগের ছবিও আমাদের দেখানো হলো। ছবিগুলো অদ্ভুত। হাজিদের সাদা টুপি
পরা কিছু লোক একটি ঘরের পাতার তৈরি চালায় আগুন দিচ্ছে।
নারীদের
দেখা যাচ্ছে- তারা নাটকীয় ভঙ্গিতে তলোয়ার এবং দা ঘোরাচ্ছে, তাদের মাথায়
টেবিলক্লথের মতো লেসের কাজ করা কাপড়। এরপর আমি দেখলাম, সেখানকার একজন ওই
স্কুলের সেই হিন্দু নারী, যিনি উত্তেজিতভাবে নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন।
আর এই ঘর পোড়ানো পুরুষদের মধ্যে একজনকে আমি সেই বাস্তুচ্যুত হিন্দুদের
মধ্যে দেখেছি।
তার
মানে, তারা এমনভাবে কিছু ভুয়া ছবি তুলেছে, যাতে মনে হয় মুসলিমরা বসতবাড়িতে
আগুন লাগাচ্ছে। মংডুতে যে মুসলিমদের সঙ্গে আমরা কথা বলতে পেরেছি, তারা
ক্যামেরার সামনে কথা বলার সাহস করেনি। আমরা দু’একজনের সঙ্গে কথা বললাম।
তারা
বললেন, নিরাপত্তা বাহিনী তাদের গ্রাম ছাড়তে দিচ্ছে না। তারা খাদ্যাভাব এবং
তীব্র আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। একজন যুবক বলছিল, তারা বাংলাদেশে
পালিয়ে যেতে চায় কিন্তু তাদের নেতারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এক চুক্তি করেছে
যাতে তারা চলে যেতে না পারে। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, তারা কীসের ভয় করছেন।
জবাব এল, সরকারের।
