ডা. মো. সাঈদ এনামঃ কিডনি আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংগ। হাতের মুষ্টি আকৃতির দুটি কিডনি আমাদের শরীরের পিছনে কোমরের ঠিক কিছু উপরে থাকে। ডান কিডনি লিভারের নীচে থাকে এবং সেটা কিছু ছোট আর বাম কিডনি থাকে প্লীহা বা স্প্লিন এর নীচে। কিডনির কাজ হলো আমাদের রক্ত ছেঁকে পরিশোধন করে দুষিত পদার্থ শরীর থেকে বের করে এতে বিদ্যমান নানান উপাদানের ভারসাম্য রক্ষা করা।
কিডনি ঘন্টায় দুবার শরীরের সকল রক্ত ছেঁকে পরিষ্কার করে এবং প্রায় ৯৯ ভাগ রক্তই ফেরত পাঠায়। ১ ভাগ পরিশোধন করে পশ্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়। কিডনি দুটি হলেও একটি কিডনির অর্ধেক সুস্থ থাকলে তাই জীবন ধারনের জন্যে যথেষ্ট।
কিডনিতে প্রায় দেড় থেকে দুই লক্ষ কুণ্ডলী পাকানো ছাকনী থাকে যাদের জোড়া দিলে লম্বায় প্রায় আট কিলোমিটার হবে।
সদ্য ভুমিষ্ট শিশুদের কিডনির আকার শরীরের তুলনায় বেশ বড়ই থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষের কিডনির ওজন প্রায় ১৫০ গ্রাম মাত্র।
কিডনি অকেজো হবার অনেক গুলো কারনের মধ্যে একটি কারন অল্প পানি পান। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের কিডনিকে সচল রাখতে দৈনিক ৩ থেকে ৪ লিটার পানি পান করতে হয়। বিভিন্ন রোগে কিডনি গোপনে, নীরবে অকেজো হয়ে যায়। শতকরা আশিভাগ কিডনি অকেজো হয়ে যাবার পরই কেবল তার লক্ষন প্রকাশ পায়।
যে সকল রোগে কিডনি নষ্ট হয় তারমধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, জীনগত ত্রুটি, মদপান ও ধুমপান উল্লেখযোগ্য।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে কিডনি তার অন্যান্য অংগের মতো কিডনিও তার কার্যক্ষমতা হারাতে থাকে। বয়স চল্লিশের পর প্রতি বছর শতকরা এক ভাগ করে কিডনি তার কার্যক্ষমতা হারাতে থাকে। সেজন্যে বয়স বাড়ার সাথে সাথে কিডনির যত্ন নিতে হয়। নিয়মিত শরীর চর্চা ও পানি পানই কিডনিকে সুরক্ষা দেয়।
রক্তের যে দুটি উপাদান দেখে আমরা কিডনি ডেমেজ কিনা বা কতটুকু ডেমেজ আমরা বলি তা হলো রক্তে ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিনি লেভেল। রক্তে ইউরিয়া লেভেল সাধারণত ২০ থেকে ৪০ ইউনিট এবং ক্রিয়েটিনিনিন লেভেল থাকে '৬ থেকে ১'২ ইউনিট। বাংলাদেশের সকল সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই পরীক্ষা একজন চিকিৎসক এর পরামর্শে নাম মাত্র মুল্যে করা হয়ে থাকে। তাছাড়া ঘরে বসেও এ পরীক্ষা করার আধুনিক যন্ত্র আবিষ্কার হয়েছে।
কিডনি পুরোপুরিভাবে অকেজো হয়ে গেলে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করতে হয়। সাধারণত নিকটাত্মীয়রা কিডনি দান করতে পারেন। যেহেতু বলেছি আমাদের দেহের সকল রক্ত আজীবন পরিশোধন করতে দুটি কিডনির প্রয়োজন পড়েনা একটি কিডনির অর্ধেক থাকলেই যথেষ্ট তাই একটি কিডনি দান করলে দাতার কোন সমস্যা হয়না। তাছাড়া ডায়ালাইসিস এর মাধ্যম্ব একজন কিডনি রোগী অনেকদিন বেঁচে থাকতে পারেন।
বাংলাদেশে এখন অহরহ কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট হচ্ছে এবং সেটা অত্যন্ত সফলতার সাথে এবং কম খরচে। যার জন্যে বিদেশ থেকেও এখন অনেক রোগী বাংলাদেশে এসে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে থাকেন।
১৯৩৩ সাথে সর্বপ্রথম কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট হলেও সফল কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয় ১৯৫৪ সালে।
কিডনি রোগের লক্ষন গুলোর মধ্যে শরীরে পানি জমা, মুখমণ্ডল ফুলে যাওয়া, হাত পা ফুলে যাওয়া, খাবারে অরুচি আসা এবং বিভিন্ন রকমের মানসিক লক্ষন প্রধান। মানসিক সমস্যা গুলোর মধ্যে ডিপ্রেশন, এনজাইটি, ডেলিরিয়াম এমন কি সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি ও থাকে।
কিডনি ফেইলর রোগীর ডিপ্রেশনে সব রকমের এন্টি ডিপ্রেসেন্ট দেয়া যায়না। এন্টি ডিপ্রেসেন্ট ড্রাগ এর মধ্যে এস এস আর আই (SSRI) কিছুটা নিরাপদ।
বিশ্বে প্রতি দশজনে একজনের কোননা কোন রকমের কিডনি রোগ রয়েছে। সবচেয়ে কমন কিডনি রোগ হলো কডনিতে পাথর হওয়া। যেহেতু আগেই বলেছি কিডনি একটি ছাঁকন যন্ত্র তাই পানি কম খেলে কিডনিতে পাথর হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এ যাবৎ সবচেয়ে বড় কিডনি পাথর অপসারণ করা হয়েছে যার আকার ছিলো একটি প্রমান সাইজের ডাবের মতো।
লেখকঃ
ডা. মো. সাঈদ এনাম
(ডি এম সি,কে-৫২)
সাইকিয়াট্রিস্ট
উপজেলা স্বাস্থ্য ও প প কর্মকর্তা
দক্ষিন সুরমা, সিলেট।
